
ড. আবুল হাসনাৎ মিল্টন:
এইচ এস সি পরীক্ষা শেষে ক্যাডেট কলেজের পাঠ চুকিয়ে খুলনায় ফিরেছি। শহরের উন্মেষ দত্ত লাইব্রেরী থেকে বই এনে সারারাত ধরে পড়ি, দুপুর অব্দি ঘুমাই আর সন্ধ্যে হলে পিকচার প্যালেসের ধারে আপ্যায়ন হোটেল চত্বরে ছাত্র মৈত্রীর বন্ধুদের সাথে আড্ডা দেই। এরকম সময়ে একদিন বাল্যবন্ধু নাজির এসে একটা সাপ্তাহিক পত্রিকা হাতে ধরিয়ে দিয়ে বলল, সময় পেলে পত্রিকাটা পড়ে দেখিস। খানিকটা হেলায় নেড়েচেড়ে দেখতে গিয়েই আটকে গেলাম। সেটি ছিল সাপ্তাহিক যায় যায় দিনের দ্বিতীয় সংখ্যা। তারপর থেকে দীর্ঘদিন শফিক রেহমান সম্পাদিত যায় যায় দিনের আমি একনিষ্ঠ পাঠক ছিলাম। এমন কী, ভেলোরে পড়ার সময়েও দেশ থেকে যায় যায় দিনের গ্রাহক করে দেওয়া হয়েছিল। তখনতো আর আজকের মত অনলাইনে পত্রিকা পাওয়া যেতো না, ডাকযোগে পাওয়া যায় যায় দিনই ছিল ভরসা। কী অসাধারন সব লেখা। অধিকাংশ সংখ্যার প্রচ্ছদ কাহিনী লিখতেন বিভুরঞ্জন সরকার। শফিক রেহমান নিয়মিত লিখতেন ‘দিনের পর দিন’ কলাম’ – এই কলামের মইন-মিলার ভক্ত ছিলাম আমরা সবাই। এরশাদ আমলে স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনেও যায় যায় দিন সাহসী ভূমিকা রেখেছিল। বাংলাদেশে তার হাত ধরেই চৌদ্দই ফেব্রুয়ারীতে ভালবাসা দিবসের প্রচলন ঘটেছিল।
নন্দিত এই সম্পাদক পরবর্তীতে লোভের কাছে বিক্রি হয়ে যায়, নাম লেখায় বিএনপি-জামায়াত ঘরাণায়। ভোল বদলানোর সেই যাত্রায় শফিক রেহমান একাই পচতে চাননি, সাথের দুয়েকজনকেও টানতে চেয়েছিলেন। তাদের একজনের কাছে আমি নিজে শুনেছি, তাকে শফিক রেহমাল বলেছিলেন ‘ঢাকা শহরে অ্যাপার্টমেন্ট, টাকা-পয়সার মালিক হতে চান না?’। বিভু দা বা স্বদেশ রায়রা ঠিকই লোভকে পায়ে ঠেলেছেন, শফিক রেহমানের সঙ্গ ত্যাগ করেছেন।
বিএনপি-জামায়াত ঘরাণার সাংবাদিক-বুদ্ধিজীবী হিসেবে তার কৃতকর্মের কথা পরবর্তীতে দেশবাসী জেনেছে। আশির দশকের সেই নির্ভীক সাংবাদিক কীভাবে অর্থের কাছে নিজের বিবেক বন্দক রেখেছে তাও আজ আর কারো অজানা নয়। সরকারী আনুকূল্যে প্রতিষ্ঠিত দৈনিক যায় যায় দিনের সাংবাদিকদের বেতন না দিয়ে দেশ ছেড়ে পালিয়ে যাবার পথে সাংবাদিকরা তাকে প্লেন থেকে নামিয়ে এনেছিল। সম্প্রতি সাংবাদিকতার চেয়ে তার অধিক সম্পৃক্ততা ছিল বিএনপি-জামায়াতের রাজনীতির সাথে। বেগম জিয়ার ভাষণের স্ক্রিপ্ট লিখে দিতেন, পাশাপাশি বিএনপির রাজনীতির আন্তর্জাতিক যোগাযোগও রক্ষা করতেন।
সেই নন্দিত-নিন্দিত শফিক রেহমান গত ১৬ এপ্রিল বাসা থেকে গ্রেফতার হবার পরে নতুন করে আলোচনায় আসে। এবং এই প্রথম লক্ষ্য করলাম, তার বয়স এখন একাশি। কথাবার্তা-চালচলন আর আধুনিকতার সমন্বয়ে তার নামের সাথে তারুণ্যের এমন একটা ইমেজ জড়িয়ে গিয়েছিল যে, আমরা ভুলেই গিয়েছিলাম, সময়ের সাথে সাথে তারও বয়স বেড়েছে। এবারে তার বিরূদ্ধে অভিযোগটি ভীষণ গুরুত্বপূর্ণ।
মিডিয়ার কল্যাণে আমরা ইতিমধ্যেই জেনেছি, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবের দৌহিত্র ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার পুত্র সজীব ওয়াজেদ জয়কে অপহরণ ও হত্যার চেষ্টা মামলায় যুক্তরাষ্ট্রে বিএনপির অঙ্গ সংগঠন জাতীয়তাবাদী সাংস্কৃতিক সংস্থার (জাসাস) নেতা মোহাম্মদউল্লাহ মামুনের পুত্র রিজভী আহমেদ সিজার ও তার আমেরিকান সহযোগী, এফবিআইয়ের সাবেক স্পেশাল এজেন্ট রবার্ট লাস্টিকের বিচার হয়েছে। তাদের আরেক সহযোগী, লাস্টিকের বন্ধু জোহান্স থ্যালারেরও কারাদন্ড হয়। সিজার ও থ্যালার এখন আমেরিকার কারাগারে বন্দী। আমেরিকায় ফাঁস হওয়া ষড়যন্ত্রটি বিচ্ছিন্ন কোন ঘটনা ছিল না। তদন্তে এর সাথে ঢাকার কয়েকজনের সম্পৃক্ততাও পাওয়া গেছে। বিএনপির পররাষ্ট্র ও কূটনৈতিকবিষয়ক সাংবাদিক শফিক রেহমান তাদেরই একজন, আমার দেশ পত্রিকার সম্পাদক মাহমুদুর রহমানও এই চক্রের সাথে জড়িত ছিল। এ সম্পর্কিত প্রমানাদি আমেরিকার জাস্টিস ডিপার্টমেন্ট ও এফবিআই বাংলাদেশ পুলিশকে সরবরাহ করেছে। এর সুত্র ধরে শফিক রেহমানকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে। জিজ্ঞাসাবাদের এক পর্যায়ে তার বাসা থেকে সজিব ওয়াজেদ জয় সংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ বেশকিছু নথিও উদ্ধার করা হয়েছে। আমার কিছুতেই বোধগম্য হয় না, জয়ের গাড়ির রং, তার চলাচলের পথের মত তথ্য দিয়ে শফিক রেহমানরা কী করবেন? যদি মনে বদ কোন উদ্দেশ্য না থাকে! বরং পত্রিকায় এসেছে, শেখ হাসিনাকে হত্যায় বারবার ব্যর্থ হয়ে এবার জয়কে টার্গেট করা হয়েছিল। জয়কে হত্যার মধ্য দিয়ে শেখ হাসিনাকে দমানো যাবে বলে হয়তো তারা ধারণা করেছিল।
শফিক রেহমানকে গ্রেফতারের সাথে সাথে স্বাধীন সাংবাদিকতা ও মত প্রকাশের অধিকার নিয়ে মুখচেনা মহলের আহাজারি শুরু হয়ে গেলো। অথচ সাংবাদিকতা সম্পর্কিত কোন বিষয়ে তাকে গ্রেফতার করা হয়নি। কেউ কেউ বলছেন, এটি বিরোধীদলকে দমনের অংশবিশেষ। তাই যদি হয়, তাহলে তো সরকার শফিক রেহমানকে অনেক আগেই গ্রেফতার করতে পারতেন। সরকারবিরোধী তৎপরতায় তো তিনি বহু বছর ধরেই জড়িত। এমন কী শেখ হাসিনার অপমৃত্যু কামনা করেও তিনি সম্প্রতি পত্রিকায় লিখেছেন। সরকারতো তখনো তাকে কিছু বলেননি। এরা সবাই শফিক রেহমানের মত প্রকাশের অধিকার নিয়ে মাতলেন, কিন্তু কেউ তার জয়কে অপহরণ ও হত্যা ষড়যন্ত্রের মত নিষ্ঠুর, অমানবিক ব্যাপারে জড়িত থাকার বিষয়টি একবারো ভেবে দেখলেন না। কেউ কেউ হাস্যকরভাবে শফিক রেহমানের গ্রেফতারকে বিগত জামায়াত-বিএনপির সরকারের আমলের ময়মনসিংহে সিনেমা হলের বোমা বিস্ফোরণের মত সাজানো মামলায় অধ্যাপক মুনতাসির মামুনদের গ্রেফতারের সাথে তুলনা করলেন। তারা কি একবারো ভেবে দেখেছেন, সিনেমা হলে মুনতাসির মামুনদের বোমা মারার মত সাজানো ঘটনা এটি নয়। এখানে সরকারের কাছে আমেরিকা থেকে সুনির্দিষ্ট কিছু অভিযোগ এসেছে, সরকারের পক্ষ থেকে প্রাথমিক তদন্ত করে অভিযোগের স্বপক্ষে কিছু প্রমাণও পাওয়া গেছে। তারপরই সরকার শফিক রেহমানকে গ্রেফতার করেছে। আমাদের তাই উচিত ছিল, তাৎক্ষণিকভাবে উল্টাপাল্টা বিবৃতি না দিয়ে সঠিক তদন্তের মাধ্যমে শফিক রেহমানের বিরূদ্ধ উত্থাপিত অভিযোগসমূহের নিষ্পত্তি করার পক্ষে দাবী তোলা। বিএনপি-জামায়াত শফিক রেহমানের পক্ষে সেচ্চার হবে এটা স্বাভাবিক, তাই বলে নিরপেক্ষতার ধ্বজাধারী বুদ্ধিজীবীরাও আগপাছ বিবেচনা না করে শফিক রেহমানের মুক্তি দাবী করে ঝাপিয়ে পড়বে, সেটা প্রত্যাশিত নয়।
সরকারের সবকিছুর বিরোধিতা করাটা বোধ হয় আমাদের জাতীয় চরিত্রেরই অংশ। তাই বলে আমাদের মনে রাখা উচিত, সরকার কিংবা আওয়ামী লীগের বিরোধিতা করতে গিয়ে আমরা যেন আমাদের মনুষ্যত্ব হারিয়ে না ফেলি। সাংবাদিকের স্বাধীনতার সাথে আমরা যেন খুনের অভিযোগকে গুলিয়ে না ফেলি। সাংবাদিকের কলমের স্বাধীনতা নিশ্চিত করা যেমন জরুরী, তেমনি জরুরী হল মানুষের জীবনের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। এককালের সাংবাদিক রেহমানের মুক্তি আমিও চাই, তবে তার আগে নিশ্চিত হতে চাই, সজিব ওয়াজেদ জয়কে অপহরণ বা হত্যার ষড়যন্ত্রে তার কোন ভূমিকা ছিল না। অপরাধী অপরাধীই, সাংবাদিকতার আড়ালে তার পার পেয়ে যাবার কোন সুযোগ নাই।
ড: আবুল হাসনাৎ মিল্টন: কবি ও চিকিৎসক, নিউক্যাসেল বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপনারত।
