

বিশেষ প্রতিনিধি: মুক্তিযুদ্ধকালীন মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে ফাঁসির দণ্ডপ্রাপ্ত মতিউর রহমান নিজামীর সময় দ্রুত ফুরিয়ে আসছে। একাত্তরের ভয়ংকর জল্লাদ আলবদর বাহিনীর প্রধান ও জামায়াতে ইসলামীর আমির নিজামীর সাজা রিভিউ বা পুনর্বিবেচনার আবেদন আপিল বিভাগ গত বৃহস্পতিবার খারিজ করে দেওয়ায় এখন দণ্ড কার্যকর করার পালা। অপেক্ষা শুধু রিভিউ আবেদন খারিজ আদেশের লিখিত অনুলিপি পাওয়ার। মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় এর আগে রিভিউ আবেদন খারিজ হওয়ার পর ফাঁসি কার্যকর হতে পাঁচ দিনের বেশি লাগেনি। আপিল বিভাগের লিখিত আদেশ পাওয়ার পর নিজামীকে রাষ্ট্রপতির কাছে প্রাণভিক্ষার আবেদন করার সুযোগ দেওয়া হবে। তবে সে জন্য খুব বেশি সময় তিনি পাচ্ছেন না।নিজামীর স্ত্রী, দুই ছেলে, এক মেয়েসহ পরিবারের ছয় সদস্য এরই মধ্যে কাশিমপুর কারাগারে তাঁর সঙ্গে দেখা করেছেন। নিজামী গাজীপুরের কাশিমপুর কেন্দ্রীয় কারাগার পার্ট-২-এর কনডেম সেলে বন্দি আছেন। পরিবারের সদস্যদের গতকাল শুক্রবার সকাল পৌনে ১১টার দিকে নিজামীর সঙ্গে সাক্ষাৎ করার সুযোগ দেয় কারা কর্তৃপক্ষ।জেল সুপার প্রশান্ত কুমার বণিক জানান, গতকাল সকালে নিজামীর পরিবারের ছয় সদস্য কাশিমপুর কারাগারে যান।তাঁদের মধ্যে ছিলেন নিজামীর স্ত্রী সামছুন্নাহার, দুই ছেলে ব্যারিস্টার নাজিবুর রহমান ও ডা. নাঈমুর রহমান,মেয়ে মহসিনা ফাতেমা এবং দুই পুত্রবধূ রায়য়ান ও ফালুয়া।তাঁদের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে সকাল সোয়া ১১টার দিকে নিজামীর সঙ্গে তাঁদের সাক্ষাৎ করার সুযোগ দেওয়া হয়। পৌনে এক ঘণ্টা সাক্ষাৎ শেষে তাঁরা বেরিয়ে যান।প্রধান বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহার নেতৃত্বে আপিল বিভাগের চার সদস্যের বেঞ্চ গত বৃহস্পতিবার নিজামীর রিভিউ আবেদন খারিজ করে আদেশ দেন। এর মধ্য দিয়ে তাঁর আইনি লড়াই শেষ হয়েছে। এখন দণ্ড কার্যকর করার পালা। এর আগে তিনি কিছুটা সময় পাবেন রাষ্ট্রপতির কাছে প্রাণভিক্ষা চেয়ে আবেদন করা না করার বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে। এ ছাড়া ফাঁসি কার্যকর করার আগে শেষবারের মতো নিজামীর সঙ্গে স্বজনদের দেখা করার সুযোগ দেওয়া হবে। মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় এর আগে আবদুল কাদের মোল্লা, মুহাম্মদ কামারুজ্জামান, সাকা চৌধুরী ও আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদের ক্ষেত্রে রিভিউ আবেদন খারিজ আদেশের কপি কারাগারে যাওয়ার দু-তিন দিনের মধ্যেই ফাঁসি কার্যকর করা হয়েছিল। কাদের মোল্লার রিভিউ আবেদন খারিজ হয়েছিল ২০১৩ সালের ১২ ডিসেম্বর। সেদিনই সংক্ষিপ্ত আদেশের কপি ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে পৌঁছায়। কামারুজ্জামানের রিভিউ আবেদন খারিজ হয় গত বছর ৬ এপ্রিল। আপিল বিভাগ ৮ এপ্রিল ৩৬ পৃষ্ঠার পূর্ণাঙ্গ আদেশ দেন। এরপর ১১ এপ্রিল রাতে তাঁর ফাঁসি কার্যকর করা হয়। এর আগে দুজনের কাছেই জানতে চাওয়া হয়েছিল তাঁরা রাষ্ট্রপতির কাছে ক্ষমা চাইবেন কি না। তাঁরা ক্ষমা না চাওয়ায় সরকারের আদেশে কার্যকর হয় ফাঁসি। সাকা ও মুজাহিদের রিভিউ আবেদন খারিজ হয় গত বছর ১৮ নভেম্বর। খারিজ আদেশ কারাগারে পৌঁছায় ২০ নভেম্বর। এরপর দুজনই প্রাণভিক্ষার আবেদন জানান। কিন্তু রাষ্ট্রপতি ওই আবেদন নাকচ করে দেওয়ার পর ২২ নভেম্বর দুজনের ফাঁসি কার্যকর হয়।মানবতাবিরোধী অপরাধীদের রাষ্ট্রপতির কাছে প্রাণভিক্ষা চাওয়ার সাংবিধানিক অধিকার না থাকলেও আপিল বিভাগ নিজ ক্ষমতাবলে তাঁদের এ সুযোগ দিয়েছেন। তাঁরা যদি রাষ্ট্রপতির কাছে কোনো আবেদন না করেন তবে সরকার যেকোনো মুহূর্তে এই দণ্ড কার্যকর করতে পারবে।কোন কারাগারে ফাঁসি কার্যকর হবে ঠিক হয়নি : নিজামীর ফাঁসি কোন কারাগারে কার্যকর করা হবে তা ঠিক হয়নি। এর আগে মানবতাবিরোধী চার অপরাধীর ফাঁসি কার্যকর করা হয়েছে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে। ওই আসামিদের ক্ষেত্রে যেদিন রিভিউ খারিজ হয়েছিল সেদিনই অন্য কারাগারে থাকলেও সেখান থেকে নিয়ে আসা হয় ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে। কিন্তু নিজামীকে এখনো কাশিমপুর কারাগারেই রাখা হয়েছে।এ বিষয়ে জানতে চাইলে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারের সিনিয়র জেল সুপার জাহাঙ্গীর কবির বলেন, ‘তাঁকে (নিজামী) ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে আনা হয়নি।’ এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘সরকার কী সিদ্ধান্ত নেবে সেটা আমরা জানি না। ’কারা সূত্রে জানা যায়, ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগার কেরানীগঞ্জে স্থানান্তরের প্রস্তুতি চলছে। এ মাসেই বন্দিদের নতুন কারাগারে স্থানান্তর করার সিদ্ধান্ত রয়েছে। কিছু মালপত্র সরানোও হচ্ছে। এ অবস্থায় নিজামীকে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে ফাঁসি দেওয়া যাবে কি যাবে না তা নিয়ে সিদ্ধান্তহীনতা রয়েছে।এক কারা কর্মকর্তা বলেন, ‘কাশিমপুর কারাগারে ফাঁসির মঞ্চ রয়েছে। সেখানে অনেককে ফাঁসি দেওয়া হয়েছে। কিন্তু কয়েক দিন আগে কারাগারের সামনে এক কারারক্ষীকে প্রকাশ্যে দিনের বেলায় হত্যা করায় নিরাপত্তা নিয়েও চিন্তার বিষয় রয়েছে।’এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘কারা কর্তৃপক্ষ সরকারের নির্দেশের অপেক্ষা করবে। যে কারগারে ফাঁসি দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হবে সেখানেই দেওয়া হবে।’জানা গেছে, রিভিউ খারিজ হওয়ার খবর গত বৃহস্পতিবারই রেডিওর মাধ্যমে শোনানো হয়েছে নিজামীকে।খবর শোনার পর তাঁকে বিচলিত দেখা যায় বলে এক কর্মকর্তা জানান।এর আগে তিনটি অপরাধের দায়ে নিজামীর মৃত্যুদণ্ড বহাল রাখেন আপিল বিভাগ। এগুলো হলো সাঁথিয়ার বাউশগাড়ি ও ডেমরা গ্রামের ৪৫০ জনকে হত্যা ও ৩০-৪০ নারীকে ধর্ষন, ধুলাউড়ি গ্রামের ৫২ জনকে হত্যা এবং ঢাকায় বুদ্ধিজীবী হত্যা। ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত দেওয়ার অভিযোগের মামলায় ২০১০ সালের ২৯ জুন নিজামীকে গ্রেপ্তার করা হয়। একই বছরের ২ আগস্ট মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে গ্রেপ্তার দেখানো হয় তাঁকে। ২০১১ সালের ১১ ডিসেম্বর নিজামীর বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে ফরমাল চার্জ (আনুষ্ঠানিক অভিযোগ)দাখিল করে রাষ্ট্রপক্ষ। ২০১২ সালের ৯ জানুয়ারি তাঁর বিরুদ্ধে অভিযোগ আমলে নেন ট্রাইব্যুনাল। এতে ১৫টি অভিযোগ ছিল। ওই বছরের ১৫ মার্চ নিজামীর বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠনের শুনানি হয়। তাঁর বিরুদ্ধে বুদ্ধিজীবী হত্যার অভিযোগ না থাকায় ট্রাইব্যুনাল ওই দিন রাষ্ট্রপক্ষের বিরুদ্ধে ক্ষোভ প্রকাশ করেন। পরে বুদ্ধিজীবী হত্যার অভিযোগ যুক্ত করে ২০১২ সালের ২৮ মে ১৬টি অভিযোগ গঠন করা হয় নিজামীর বিরুদ্ধে। ২০১৪ সালের ২৯ অক্টোবর ট্রাইব্যুনাল এক রায়ে নিজামীকে মৃত্যুদণ্ড দেন। এ রায়ের বিরুদ্ধে ওই বছরের ২৩ নভেম্বর আপিল বিভাগে আপিল করেন নিজামী। গত ৬ জানুয়ারি আপিল বিভাগও মৃত্যুদণ্ড বহাল রাখেন।
