
সোনাগাজীর আলো ডটকম:-জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান হত্যার প্রতিবাদে ১৯৭৫ সালে তৎকালিন যৌথবাহিনীর সঙ্গে বারবার সম্মুখযুদ্ধের অন্যতম নায়ক বীর মুক্তিযোদ্ধা বিশ্বজিত নন্দী’র খোঁজ খবর রাখে না কেউই।
নির্মম নির্যাতন ও বঙ্গবন্ধুর হত্যার প্রতিবাদ করে ব্যর্থ হওয়ার স্মৃতি নিয়ে অন্ধকার ঘরকে সঙ্গী করে নেয় বীর মুক্তিযোদ্ধা বিশ্বজিত নন্দী। এতদিন যাবৎ কিভাবে ঘুরছে তার জীবন-চাকা জানে না বঙ্গবন্ধুর পরিবারের কেউ।
এত কিছুর সাথে নতুন করে তার জীবনে যোগ হয়েছে বঙ্গবন্ধুর নিজ হাতে গড়া আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের পক্ষ থেকে খোঁজ না নেওয়ার অভিমানও।
অস্ত্র হাতে তুলে নিয়ে টানা আট ঘণ্টার সশস্ত্র যুদ্ধে সহযোদ্ধাদের হারিয়ে গুলিবিদ্ধ অবস্থায় প্রাণে বাঁচলেও অন্ধকার কুঠুরিতে নির্মম নির্যাতনের শিকার এ মহানায়কের নামই জানে না তরুণ প্রজন্ম। জানেই না কে এই বিশ্বজিত নন্দী? যার নামের সাথেই জড়িয়ে আছে বাঙ্গালী জাতির কলঙ্কময় অধ্যায় ১৯৭৫ সালের না জানা নির্মম ইতিহাস।
কে এই বিশ্বজিত নন্দী?
বাঙালি জাতির কলঙ্কময় অধ্যায় ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধু হত্যার প্রতিবাদে গর্জে উঠা মুক্তিযোদ্ধাদের অন্যতম নায়ক বিশ্বজিত নন্দী। তিনি ১৯৫৬ সালে ময়মনসিংহের মুক্তাগাছার প্রত্যন্ত গ্রাম গোবিন্দপুরে জন্মগ্রহন করেন। বাবা সুধারঞ্জন নন্দী। মা সুভাষিণী নন্দী।
নবম শ্রেনীতে অধ্যায়নরত অবস্থায় বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ডাকে সাড়া দিয়ে অংশগ্রহন করেন মুক্তিযুদ্ধে। দীর্ঘ নয় মাস রক্তক্ষয়ী যুদ্ধেও রয়েছে তার বীরত্বগাথা।
দেশ স্বাধীন হওয়ার পর আবার লেখাপড়া শুরু করেন। সেই সময়ই সপরিবারে বঙ্গবন্ধুর নৃশংস হত্যাকান্ড তাকে প্রচন্ডভাবে আন্দোলিত করে তোলে। মহান মুক্তিযুদ্ধের পর আরো একবার অস্ত্রহাতে তুলে নেওয়ার সিদ্ধান্তে অটল এই বীর মুক্তিযোদ্ধা জীবনের মায়া ত্যাগ করে রাজপথে নেমে আসেন সশস্ত্র। গঠন করেন জাতীয় মুক্তিবাহিনী নামের সংগঠন। ময়মনসিংহের সীমান্ত এলাকায় ক্যাম্প স্থাপন করে শুরু হয় আন্দোলন। সেখানে কাদের সিদ্দিকী বীরউত্তম-এর তত্ত্বাবধানে সক্রিয় যুদ্ধে অংশ নেন বিশ্বজিৎ নন্দী। ১৯৭৬ সালের ১৪ আগস্ট মুক্তাগাছা এলাকায় সশস্ত্র অভিযানে গিয়ে গুলিবিদ্ধ অবস্থায় আটকের পর ১৯৭৭ সালের ১৮ মে সামরিক আদালত ১৯ বছর বয়সী গেরিলাযোদ্ধা বিশ্বজিতকে ফাঁসির দণ্ড ঘোষণা করে। তাকে রাখা হয় ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারের কনডেম সেলে। এ ফাঁসির সেলের বিভিন্ন কক্ষে বিশ্বজিৎ নন্দীর কাটে সাত বছরের দুর্বিষহ জীবন।
বিশ্বজিত নন্দীর বাবা তৎকালীন রাষ্ট্রপতির কাছে ছেলের প্রাণভিক্ষা চাইলেও তা পাননি। নিশ্চিত মৃত্যুর প্রতীক্ষায় থাকা বিশ্বজিত নন্দী কে চার দফা ফাঁসির দড়িতে ঝুলানোর চূড়ান্ত উদ্যোগ নিয়েও তৎকালীন ভারতের প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর সরাসরি হস্তক্ষেপ এবং আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাগুলোর জোরালো প্রতিবাদের কারণে বেঁচে থাকেন বিশ্বজিৎ। ১৯৮৪ সালে বিশ্বজিৎ নন্দীর ফাঁসির রায় মওকুফ করে রাষ্ট্রপতির নির্দেশে আদালত যাবজ্জীবন কারাদণ্ডের আদেশ দেন। কনডেম সেল থেকে তখন তাকে স্থানান্তর করা হয় অন্য সেলে। এরপর সব আইনি প্রক্রিয়া সমাপ্ত করে ১৯৮৯ সালের ১৪ ডিসেম্বর কারাগার থেকে মুক্ত হন তিনি।
বিশ্বজিৎ নন্দী দীর্ঘ কারাভোগের সময়ও লেখাপড়া চালিয়ে যান। জেল থেকেই পরীক্ষা দিয়ে বিএ পাস করেন। পরে টাঙ্গাইলের করটিয়া সা’দত বিশ্ববিদ্যালয় কলেজ থেকে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি করেন।
সাত বছরের দুর্বিষহ জীবন আর বঙ্গবন্ধুর হত্যার প্রতিবাদে ব্যর্থ হওয়ার যন্ত্রনা বুকে নিয়েই ১৯৯৭ সালের ৮ মে তিনি চিত্রা দাস’র সাথে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন। শুরু করেন সংসার জীবন। কিন্তু যন্ত্রনা তাকে এতটাই কুড়ে কুড়ে খাচ্ছিল যে সে নিজেকে ঘর থেকে বাইরে আনতে পারেনি।
তার স্ত্রী চিত্রা দাস বাসাইলের মার্থা লিন্ডস্ট্রম নূরজাহান বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের শিক্ষিকা।
১৯৯৮ সালের ৩১ মার্চ তিনি প্রথম বাবা হন। জন্ম নেয় মেয়ে সন্তান। মেয়ে সহিষ্ণুতা নন্দী এবছর টাঙ্গাইলের সরকারী কুমুদিনী মহিলা কলেজ থেকে এইচএসসি পরীক্ষায় অংশগ্রহন করেছে।
২০০৪ সালের ১০ জুন তার সংসারে আসে নতুন অতিথি। ছেলে দেবজিত নন্দী। দেবজিত পড়ছে টাঙ্গাইলের ঐতিহ্যবাহী ও স্বনামধন্য বিন্দুবাসিনী সরকারী বালক উচ্চ বিদ্যালয়ের সপ্তম শ্রেণিতে।
তাদের নিয়েই বিশ্বজিৎ নন্দী বসবাস করছেন টাঙ্গাইল শহরের প্যারাডাইস পাড়ার মাসি শ্বাশুরীর বাড়িতে।
যৌবনের পুরোভাগ জেলের প্রকোষ্ঠে কাটানো বিশ্বজিৎ নন্দীর জীবন যুদ্ধের সাথে মিশে থাকা বাঙ্গালী জাতির কলঙ্কময় অধ্যায়ের না জানা ইতিহাস তারই মুখে শুনেছেন তার স্ত্রী। কিন্তু বাঙ্গালী জাতির এ বীরসন্তান যত বারই মুশড়ে পড়েছে ততবারই তার পাশে দাড়িয়েছে স্ত্রী চিত্রা দাস।
দূর্বিসহ জীবনের স্মৃতি থেকে বের হতে না পারা বিশ্বজিৎ নন্দীর কস্ট কমাতে সংসারের হাল ধরেছে তার স্ত্রী। সন্তানদের মানুষের মত মানুষ করা থেকে শুরু করে পুরো সংসারের ব্যয় একাই বহন করে আসছেন তিনি।
বঙ্গবন্ধুর আদর্শের সৈনিক, মুজিবভক্ত হিসেবে জীবনবাজি রাখা বিশ্বজিৎ নন্দীর জীবন কাটছে আজ সীমাহীন অবহেলায়, চরম কষ্টে। ফাঁসি থেকে প্রানে বেচেঁ যাওয়া তার জীবনচাকা ঘুরছে স্ত্রীর উপার্জনে।
তার স্ত্রী চিত্রা দাস পূর্বপশ্চিমবিডিকে জানান, বিশ্বজিৎ নন্দীর জীবনে অন্যতম একটি শ্রেষ্ঠ দিন ১৯৮৯ সালের ১৪ ডিসেম্বর। সেদিন জেলমুক্ত হতেই শেখ হাসিনা তাকে ফুলের মালা দিয়ে তার সঙ্গেই ধানমন্ডির ৩২ নম্বর বাড়িতে নিয়ে যান। সেখানেই থাকার ব্যবস্থা করে দিয়েছিলেন বঙ্গবন্ধুকন্যা।’ কিন্তু ১৯৯৪ সালের পর থেকে আর বঙ্গবন্ধুর পরিবারের কেউই খোঁজ রাখেনি এই বীর নায়কের। বঙ্গবন্ধুর স্বাধীন বাংলায় আজ তারই হত্যার প্রতিবাদকারীরা অবহেলায় লোকচক্ষুর আড়ালেই রয়ে গেছে। আজ পর্যন্ত কোনদিন বঙ্গবন্ধুর নিজের হাতে গড়া দল আওয়ামী লীগ এর একজন নেতাকর্মীও আসেনি তার খবর জানতে।
দেশের ইতিহাস বিকৃতকারিরা যখন তৎপর, তখনও সঠিক ইতিহাস জানতে কেউই আসেনি স্বাধীনতার ইতিহাসের একজন প্রত্যক্ষ স্বাক্ষী বিশ্বজিৎ নন্দীর কাছে। তাকে কোনদিন এ জাতী মূল্যায়ন করেনি, তাতে কোন রাগ ক্ষোভ নেই তার পরিবারের। তবে দেশের ও বাঙ্গালী জাতির সঠিক ইতিহাসকে তুলে ধরতেই অবহেলিত এ মানুষটিকে আলোর সামনে তুলে এনে নতুন প্রজন্মের কাছে সঠিক ইতিহাস তুলে ধরার দাবি তার পরিবারের।
