
★★মারকায উমর রা. মাদরাসা★★
আমার হৃদয় সাগরে কল্লোলিত এক তরঙ্গের নাম। যার ছলাৎ ছলাৎ শব্দে আমি শিহরিত হই।যে নামটি মনে হলেই অন্তরের গহীন কোনে আনন্দের হিল্লোল বয়ে যায়। শরীরের প্রতিটি শিরা উপশিরায় অনুভব করি এক অপার্থিব ভালোলাগা।কারন তার সাথে যে রয়েছে আমার নাড়ীর সম্পর্ক।
দুরন্ত কৈশরের একটি বছর সেখানেই কাটিয়েছি।এরপর অনিচ্ছা সত্বেও চলে আসতে হয়েছিল ভাগ্যের হেরপেরে।
তবু সেখানকার মাটি এখনো আমায় কাছে টানে।সেই মাটির প্রতিবেশী মানুষগুলোর অজানা আকর্ষনে ছুটে যাই মুগ্ধমনে। ঈর্ষা জাগানিয়া এই সিফাত কি তারা অর্জন করেছে মাটির ছোঁয়ায়…?
নাকি মাটিই ধন্য হয়েছে তাদের পবিত্র পরশে…?আসলে ভাগ্য যাদের সুপ্রসন্ন, তকদীর যাদের ভালো, কুদরত তাদের জন্য ব্যবস্থা করে দেন এমনই স্বর্ণপ্রসবা ভুমি।
-ذالك فضل الله يوءتيه من يشاء-
আমার প্রিয় মারকাযের পক্ষ থেকে প্রথমবারের মতো প্রতিষ্টার অর্ধযুগ উপলক্ষে স্বরনিকা প্রকাশ হতে যাচ্ছে।
সংবাদটি যখন প্রথম শুনেছিলাম কিযে খুশি লেগেছিল তা কেবল উপর ওয়ালাই জানেন।কলমের ভাষা সেই অনুভুতি প্রকাশ করতে আমি অপারগ।ক্ষমা করুন আমার কলমের অক্ষমতা। উস্তাদে মুহতারাম প্রিয় মারকাযের ভাইস প্রিন্সিপাল, পিতাতুল্য শাইখ গোলাম সারোয়ার সিরাজী হাফিযাহুল্লাহু কাছ থেকে খবরটা জানলাম। জেনেছি আর সুখের ভেলায় ভেসে বেড়াচ্ছি। কল্পনার তুলিতে আঁকছি স্বরনিকার ছবি।
ঠিক তখনি তিনি আমাকে অবাক করে দিয়ে যে কথাটি বললেন তা শুনার জন্য আমি কোনভাবেই প্রস্তুত ছিলামনা। তিনি বললেন “আবদুল হামিদ…..! স্বরনিকার জন্য তুমিও একটা লেখা তৈরি কর” আমি যেন আকাশ থেকে পড়লাম…! কারন লেখালেখি আর আমি,দুইটা যে দুই মেরুর বাসিন্দা…!! ওযরখাহি করলাম। এবার কিছুটা আদেশের সুরে আদর মিশ্রিত কন্ঠে বললেন। অনিচ্ছাকৃত “আচ্ছা” বলেদিলাম।
আমি আমার অপারগতা জানি,আর এটাও জানি যে আমার প্রতি আস্থা থাকার কারনেই তিনি আমাকে লিখতে বলেছেন। আপন উস্তাদের নিকট আস্থাভাজন হওয়া যেকোন ছাত্রের জন্যই পরম পাওয়া।এটা আমার প্রাপ্য নয়,প্রাপ্তি।
“আচ্ছা” তো বলেদিলাম,এবার ভাবছি কী লিখবো…?
ভাবনা তার সর্বোচ্ছ গতিসীমা পার করছে তবুও চুড়ান্ত কোন সিদ্ধান্তে পৌঁছতে পারছেনা।
তারা পারেন, যারা কাগজের বুকে কলমের আঁচড়ে সুন্দরের ছবি আঁকেন। কিন্তু আমিতো সেই জগতে এক “আজনবী”…!
স্বৃতিতে নানান কথা এসে ভিড় করছে কিন্তু কলমের ডগায় আসতেই যতো আপত্তি তাদের…!!
আমি ভাবছি। আমার ভাবনাটা আমাকে নিয়ে গেল ৩বছর পিছনে। যখন আমি মারকায পরিবারে এক নতুন অতিথি। এতোদিন ছিলাম বাড়ির অদুরেই অবস্থিত মাদরাসায়। হটাৎ করে দুরে আসায় মনটা ভীষন খারাপ। আব্বু আম্মুর কথা খুব মনে পড়ছে। দুষ্ট ছোট্ট ভাইদের নির্মল মুখখানি বারবার চোখের পর্দায় ভেসে উঠছে।আমি যেন শুনতে পাচ্ছি,আমার বন্ধুরা আমায় ডাকছে। কল্পনার জগতে নিজেকে বন্ধুদের মাঝে আবিষ্কার করছি, আর কিছুটা সুখানুভুতি লাভ করছি। কিন্তু যখন বাস্তবে ফিরে এলাম তখন নিজেকে আরো অসহায় মনে হলো।
অপরদিকে মারকাযের অবস্থা ছিল সম্পুর্ণ ভিন্ন।আমার মতো নবাগত অতিথিদের কে স্বাগতম জানানোর সব আয়োজনই সেখানে বিদ্যমান ছিল।কিন্তু আমার মতো যারা “বাড়ি পাগল” তাদের এতো কিছু ভাবার সময় কোথায়…!!!
দিন যায়,রাত আসে।ধীরে ধীরে কাটতে শুরু করে আমার আজনবী ভাব। উস্তাদগণের স্নেহপরশে আমি ধন্য হই।সহপাঠীদের মুহাব্বতপূর্ণ আচরনে আমি বিমোহিত হই।নিজেকে এখন মারকায পরিবারের একজন ভাবতে ইচ্ছে করে।বুঝতে পারি মনের অজান্তেই ভালোবাসার এক অদৃশ্য সেতুবন্ধনে আটকা পড়ছি আমি।যে ভালোবাসা পার্থিব জীবনের কোন কিছু হাসিলের জন্য নয়।যার পিছনে কাজ করছেনা ভোগবাদী কোন মনোভাব। যার উদ্দেশ্য কেবলই “রেযায়ে মাওলা”।
জাগতিক ভালোবাসা আর “হুব্বে ফিল্লাহর” মাঝে ফারাকটা তো এখানেই।
সময় তার আপন গতিতে এগিয়ে চলে।ঘড়ির কাঁটা ঘুরতে থাকে অবিরাম।সময়ের সাথে পাল্লা দিয়ে বাড়তে থাকে মারকাযের প্রতি আমার আকর্ষন।কটা দিন আগেও যেটাকে জেলখানা মনে হতো কালের বিবর্তনে এখন সেটাই আমার কাছে স্বর্গীয় সুখের নীড়।মারকাযের প্রতিটি ইট,বালু-কনার সাথে হয়ে গেছে আমার গভীর মিতালী।এখন আর আমার সময়গুলো নিঃস্বঙ্গ কাটেনা।কেউ আমাকে গোমড়া মুখে বসে থাকতে দেখেনা।একাকীত্ব,নির্জনতা এখন আমার যেন অপরিচিত।
পুরো মারকায জুড়ে চলে আমার দুরন্তপনা। কখনো যদি সেটা সীমাতিরিক্ত হয়ে যায়,স্নেহমাখা শাসনের সাথে সাথেই শুধরে দেন আমার প্রিয় উস্তাদগণ।ক্লাশে কিংবা ক্লাশের বাইরে সর্বত্রই আমাদের প্রতি সজাগ দৃষ্টি রাখেন।আমাদের উন্নতি,অগ্রগতির চিন্তায় সর্বদা বিভোর থাকেন।পিতৃসুলভ মমতার চাদরে জড়িয়ে রাখেন সবসময়।এভাবেই কেটে যাচ্ছিলো আমার জীবনের শ্রেষ্ঠ দিনগুলি।
আমাদের কওমী অঙ্গনে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই ছাত্র শিক্ষকের মাঝে বিশাল দুরত্ব লক্ষ্য করা যায়।যা কোনভাবেই কাম্য নয়।যে হবে আগামী দিনের নববী শিক্ষায় উজ্জীবিত আলেম সমাজের প্রতিনিধি। সে যার থেকে নববী উদ্যানে প্রবেশের পাথেও পাবে। যার হাত ধরে সেখানে পথচলা শিখবে। সর্বদা যদি তার ভয়েই তটস্থ থাকতে হয়,তাহলে পথচলা খুব মসৃন হবে মনে হয়না।যে মানুষটি একজন ছাত্রকে জন্মগত মানুষ থেকে গুনগত মানুষ হতে সহায়তা করে।সেই ছাত্রের তরপ থেকে অবশ্যই তার সর্বোচ্ছ সম্মান প্রাপ্য।তার প্রতি ভক্তি ও স্রদ্ধায় অন্তর থাকতে হবে টইটুম্বুর।কিন্তু সেই স্রদ্ধা প্রকাশের মাধ্যম কি সীমাহীন ভীতি…..?
আর কি কোনও পদ্ধতি নেই…??
আছে,অবশ্যই আছে।যেটা আমি প্রত্যক্ষ করেছি প্রিয় মারকাযে। ছাত্রদের মাঝে ছিল পরিপুর্ন উস্তাদভক্তি।প্রয়োজনে উস্তাদগণও ছাত্রদের সাথে মিশে যেতেন অবলীলায়।অস্তিত্বের প্রতিটি কনা বিলিন করে ভাবতেন শুধুই ছাত্রদের কথা।নিজেই অনুভব করেছি উস্তাদ-শাগরেদের গভীর মিতালী।মুহাব্বতের পবিত্র বন্ধন।
পৃথিবীর প্রাকৃতিক নিয়ম মেনেই অবশেষে সেই দিনটি হাজির হলো,যেদিন সেই বন্ধন বাহ্যিকভাবে ছিন্ন করতে হলো।মারকায ছেড়ে আমি চলে গেলাম অন্য ঠিকানায়।
মারকাযে আমার সেই চেনা পরিবেশ,আমার প্রিয় উস্তাদগণ,আমার সহপাঠীরা চোখের আড়াল হয়েছে ঠিকই।কিন্তু মনের আড়াল কখনোই হয়নি। তার মধ্যে উল্যেখযোগ্য আমার প্রিয় ওস্তাদে মুহতারাম মাওলানা নূরুল করীম ও মাওলানা গোলাম সারোয়ার সিরাজী।
ভাবে অনুভবে সর্বদা তাদেরকেই খুঁজেছি।
এখন মারকায সার্বিকভাবে আরো উন্নত হয়েছে। ৫বছর আগে কলি হয়ে ফোটা পুষ্পটি এখন সুরভী বিলায় আপন মহিমায়।
ধর্মীয় ও আধুনিক শিক্ষার সমন্বয়ে গঠিত সিলেবাসে পড়াশোনা করে মারকাযের স্বপ্ন সারথীরা এগিয়ে যাচ্ছে বহুদুর…!
ভাবতেই ভালো লাগে যে “একসময় আমিও এই বাগানের মৌমাছি ছিলাম।
পরিশেষে বলি, মারকায উমর রাঃ একটি পুষ্পকানন।যেখানে সুদক্ষ মালির নিবিড় পরিচর্যায় প্রতিটি ফুল সুভাস ছড়ায়।মারকায একটি মৌচাক,যেখান থেকে প্রতিনিয়ত বিতরন করা হয় ইলমে ওহীর খাটি মধু।
সকল প্রতিকুলতা অতিক্রম করে আমার প্রিয় প্রতিষ্ঠান এগিয়ে যাবে আপন লক্ষ্যপানে।
এই প্রত্যাশায় রইল…..
লেখক পরিচিতি :
মু.আবদুল হামীদ বাবলু
পিতা : জনাব আবদুল হালীম
প্রাক্তন ছাত্র : মারকায উমর রা. মাদ্রাসা
দক্ষিন চর সাহাভিকারী, জমাদার বাজার।
সোনাগাজী, ফেনী।
মোবাইল : ০১৮৩৮১৭০৮৪৭
