
সেপ্টেম্বর ৯, ২০১৬
জাতীয় সংসদে যে কয়জন নারী সদস্য আলোচনায় উঠে এসেছেন, সবার নজর কেড়েছেন, অ্যাডভোকেট নূরজাহান বেগম মুক্তা তাদের অন্যতম। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আইনশাস্ত্রে এল.এল.বি (অনার্স) ও এল এল এম ডিগ্রী লাভ করেন। ১৯৯৩ সাল থেকে তিনি আইন পেশায় যুক্ত আছেন। ১৯৯৬ সাল থেকে সুপ্রিম কোর্টে আইনজীবী হিসেবে প্র্যাকটিস শুরু করেন।
পারিবারিকভাবেই রাজনীতির হাতে খড়ি নুরজাহান বেগম মুক্তার। বাবা মরহুম আবু জাফর মু. মঈনউদ্দিন ছিলেন মুক্তিযোদ্ধা, সাবেক সংসদ সদস্য ও আওয়ামী লীগের ডাকসাইটের নেতা। সেই সুবাদে ছাত্র জীবনেই জড়িয়ে পড়েন রাজনীতিতে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াকালে শামসু্ন্নাহার হলের সাধারণ সম্পাদক ও পরে কেন্দ্রীয় কমিটিতে পদ লাভ করেন মুক্তা।
আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর একাত্তরে মুক্তিযুদ্ধের সময় সংগঠিত মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচারের জন্য গঠিত ট্রাইব্যুনালে শুরু থেকেই নূরজাহান বেগম মুক্তা প্রসিকিউটর (ডেপুটি এটর্নি জেনারেল) হিসেবে সুনামের সাথে দায়িত্ব পালন করেছেন। বিচার কাজ পরিচালনায় যথেষ্ট দক্ষতার পরিচয় দিয়েছেন তিনি।
বর্তমানে আওয়ামী লীগের সক্রিয় রাজনীতিতে যুক্ত তিনি। চাঁদপুর জেলা মহিলা আওয়ামী লীগের সভাপতি এবং বাংলাদেশ মহিলা আওয়ামী লীগের আন্তর্জাতিক বিষয়ক সম্পাদক।
আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনে তিনি চাঁদপুর-৫ (হাজীগঞ্জ-শাহরাস্তি) আসন থেকে আওয়ামী লীগের টিকিটে মনোনয়ন প্রত্যাশী নূরজাহান বেগম মুক্তা। বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় পূর্বপশ্চিম অফিসে এসেছিলেন জাতীয় সংসদের সংরক্ষিত আসনের এমপি নূরজাহান বেগম মুক্তা। কথা হলো তার রাজনীতি, আদর্শ, পরবর্তী ভাবনা, ছাত্র রাজনীতির একাল-সেকাল, বঙ্গবন্ধু এবং শেখ হাসিনার আদর্শ ধারণ করে তিনি যেভাবে নিজ এলাকায় কাজ করছেন, টেলিভিশনের টক শো রাজনীতি, জঙ্গিবাদ, নারীর ক্ষমতায়নসহ আরো বেশ কিছু বিষয় নিয়ে। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন আমাদের নিজস্ব প্রতিবেদক উৎপল দাস। ছবি তুলেছেন দ্বিপময় চৌধুরী ডিউক।
পূর্বপশ্চিম: রাজনৈতিক পরিবারেই বড় হয়েছেন। পিতা মরহুম আবু জাফর মু. মঈনউদ্দিন ছিলেন মুক্তিযোদ্ধা, সাবেক সংসদ সদস্য এবং চাঁদপুর জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক। রাজনীতিতে আসার ক্ষেত্রে পিতা এবং পরিবারের ভূমিকাকে কিভাবে মূল্যায়ন করবেন?
নূরজাহান বেগম মুক্তা: জন্মের পর থেকেই দেখেছি বাড়িতে হাজারো মানুষের আনাগোনা। সকাল হতেই মানুষজন নানা সমস্যা নিয়ে আব্বার কাছে আসত সমাধানের আশায়। তখন রাজনীতি কি বুঝতাম না। সারাদিনে হাজার মানুষের খাওয়া, দাওয়া, সমস্যা সমাধান, মায়ের সহাস্য যন্ত্রণা সহ্য করে মানুষের উপকার করা। ছোটবেলায় রাজনীতি বলতে এসবই বুঝতাম। ধীরে ধীরে বুঝতে শুরু করি মানুষের কল্যাণে কাজ করার সর্বোত্তম পথটি হচ্ছে রাজনীতি। যার মাধ্যমে সাধারণ মানুষের কাছে যাওয়া যায়, তার প্রয়োজনে নিজেকে বিলিয়ে দেয়ার মধ্যে অন্যরকম, অভূতপূর্ব এক আনন্দ কাজ করে। পাশাপাশি দায়িত্বশীলতাও রয়েছে অনেকে। সময় যত গড়িয়েছে আব্বার কাছ থেকে শিখেছি- কিভাবে মানুষের উপকার করতে হয়। রাজনীতিতে আসার ক্ষেত্রে বাবা এবং আমার পুরো পরিবারেই অনবদ্য অবদান রয়েছে। তাদের প্রতি আমার কৃতজ্ঞতার শেষ নেই। তবে আমি সক্রিয় রাজনীতি শুরু করি ১৯৮৪ সালে, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়া অবস্থায়।
পূর্বপশ্চিম: দেশের সর্বোচ্চ বিদ্যাপীঠ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময় সক্রিয় রাজনীতিতে জড়িয়ে পড়েন। স্বৈরাচার পতন থেকে শুরু করে গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ গঠনে ছাত্র রাজনীতির ভূমিকা অনস্বীকার্য। আপনাদের সময়কার ছাত্র রাজনীতি এবং বর্তমান ছাত্র রাজনীতির মধ্যে কোন মৌলিক পার্থক্য কি খুঁজে পান?
নূরজাহান বেগম মুক্তা: এ দেশের ছাত্র রাজনীতির যে ধারা তাতে করে ৯০ দশকের ছাত্র রাজনীতি অবশ্যই গৌরবের, মর্যাদা আর সম্মানের। সে সময় রাজনীতি করতে গিয়ে এক ধরনের উন্মাদনা কাজ করতো। লেখাপড়ার পাশাপাশি সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়ার জন্য আমরা রাজনীতি করেছি। কোন অন্যায়কে আমাদের সময় সহ্য করিনি। প্রতিবাদ করেছি। যখন শামসুন্নাহার হলের সাধারণ সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালক করেছি তখন সর্বোচ্চ চেষ্টা করেছি ছাত্রীদের সমস্যা সমাধান করার জন্য। ডাইনিং থেকে শুরু করে রুম বরাদ্দের ক্ষেত্রে আমরা ভালো কিছু করার চেষ্টা করেছি। ছাত্র রাজনীতি এতটাই ভালো লাগতো যে- ক্লাস করতাম এনেক্স ভবনে কিন্তু মন পড়ে থাকতো মধুর ক্যান্টিনে। বর্তমান সময়ের ছাত্র রাজনীতিও যথেষ্ট সাহসিকতা নিয়ে করতে হয়। মূল্যবোধকে জাগ্রত রেখে মর্যাদা ধরে রেখেই ছাত্ররা রাজনীতি করছেন। তবে এক্ষেত্রে একটা কথা না বললেই নয়, এদেশের ছাত্রদের হাতে অস্ত্র আর নগদ অর্থ তুলে দিয়েছিলেন জিয়াউর রহমান। তার সেই ভুলের মাসুল অনেক দিন গুণতে হয়েছে দেশকে। সে অবস্থা থেকে অনেকটা বেরিয়ে এসে মর্যাদাপূর্ণ গৌরবের ছাত্ররাজনীতির ধারা আবারো শুরু হয়েছে। এটাই হচ্ছে আশার কথা।
পূর্বপশ্চিম: আওয়ামী লীগের রাজনীতির সঙ্গে জড়িত রয়েছেন। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে নিয়ে নানাজন কটুক্তি করার চেষ্টা করছে, বিষয়টাকে আপনি কিভাবে দেখেন ?
নূরজাহান বেগম মুক্তা: বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান হচ্ছেন বাংলাদেশের স্বাধীনতার অমর কাব্যের কবি। তার জন্যই একটি স্বাধীন দেশ পেয়েছি। আজ আপনার সঙ্গে এখানে কথা বলতে পারছি। বুক ভরে নিশ্বাস নিতেও পারছি। তার জন্ম না হলে এই বাংলাদেশেরও জন্ম হতো না। তাকে নিয়ে যারা কটুক্তি করেন তারা আসলে কেন এমনটা করছেন তা বোধগম্য নয়। হয় তারা মানসিকভাবে বিকারগ্রস্ত নয় দেশদ্রোহী। তাদের থামানোর চেষ্টা করেও খুব বেশি লাভ নেই। কারণ চোরে না শুনে ধর্মের কাহিনী।
পূর্বপশ্চিম: দেশকে অস্থিতিশীল করতে একটি মহল জঙ্গিবাদের উত্থান ঘটানোর চেষ্টা করছে। আইন শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী তাদের দমন করার সর্বাত্মক চেষ্টা করে যাচ্ছে। বাংলাদেশকে পিছিয়ে নেয়ার এ ষড়যন্ত্র রুখতে আপনার মতামত কি?
নূরজাহান বেগম মুক্তা: জঙ্গিবাদ এখন আর কোন একটি দেশের সমস্যা নয়; বৈশ্বিক সমস্যা। বাংলাদেশের ইতিহাসে গত ১ জুলাই গুলশানে যে জঙ্গি হামলা হয়েছিল তা ছিল এ দেশকে অকার্যকর রাষ্ট্রে পরিণত করার পাঁয়তারা। বেছে বেছে উন্নয়ন সহযোগী দেশের নাগরিকদের হত্যা করার উদ্দেশ্যেই গুলশানে হামলা চালানো হয়। আর জঙ্গিরা মোটেও আইএসের সদস্য নয়। তারা এ দেশে বেড়ে ওঠা ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক দলগুলোর সদস্য। যারা আইএসের মতো কাপড় পড়ে ছবি তুলে দেশকে পিছিয়ে দেয়ার ষড়যন্ত্র করেছিল। আর তাদের পৃষ্ঠপোষকতায় রয়েছে বিএনপি-জামায়াত। জঙ্গি ইস্যুতে খালেদা জিয়া জাতীয় ঐক্যের ডাক দিয়েও কিছুই করতে পারলেন না কারণ তার সঙ্গেই জঙ্গিরা থাকে। জামায়াতকে ত্যাগ করা বিএনপির পক্ষে সম্ভব নয়। আর এই জামায়েতই হচ্ছে জঙ্গিদের পুষ্টিদাতা। যারা যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের সময় নীরব থাকে তারা এদেশকে নিয়ে ষড়যন্ত্র করবেই। তবে প্রধানমন্ত্রী ও বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনার নেতৃত্বে সব বাঁধা পেরিয়ে বাংলাদেশ এগিয়ে যাচ্ছে এবং এগিয়ে যাবে।
পূর্বপশ্চিম: নিজের জন্য বরাদ্দকৃত টাকা নিজ এলাকার গরীব, অসহায়, বেকারদের মধ্যে বিতরণ, ধর্মীয় উপাসনালয়গুলোতে দান, রাস্তাঘাটের উন্নয়ন, বেকারদের কর্মসংস্থানসহ নিজ এলাকার মানুষের জন্য কাজ করে যাচ্ছেন। ভবিষ্যতে আরো কি কি করতে চান?
নূরজাহান বেগম মুক্তা: আপনারা জানেন চাঁদপুর একটি নদীভাঙন প্রবণ এলাকা। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নির্দেশে নদী ভাঙন রোধে চাঁদপুর রক্ষার জন্য যেসব দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা গ্রহণ করেছেন, সেগুলো ঠিকমতো কাজ করছে বলেই এখনো চাঁদপুর টিকে রয়েছে। নদী ভাঙনের কবলে পড়ে যারা গৃহহীন হয়েছেন, তাদের সবাইকে নতুন করে বসবাসের জায়গা করে দেয়া হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী বলেছিলেন-বাংলাদেশে কোন মানুষ গৃহহীন থাকবে না। আমাদের আস্থার নাম শেখ হাসিনা। তার নির্দেশিত পথেই এলাকার মানুষের উন্নয়নে বিশেষ করে গরিব, দুস্থ, অসহায় এবং বেকার নারীদের জন্য আমি বেশ কয়েকটি প্রকল্প নিয়েছি। সেগুলোর মধ্যে হাঁস-মুরগির খামার, সেলাই মেশিন, মৎস প্রকল্প গ্রহণ করে অনেকে তাদের দুঃখ গুছিয়েছেন।
পূর্বপশ্চিম: অক্টোবরে আওয়ামী লীগের ২০ তম কাউন্সিল। কাউন্সিলকে ঘিরে রাজনীতি নতুন মাত্রা পেয়েছে আওয়ামী লীগে। কাউন্সিলকে ঘিরে আপনার স্বপ্ন ও প্রত্যাশার কথা বলুন।
নূরজাহান বেগম মুক্তা: আওয়ামী লীগ দেশের সবচে বৃহৎ রাজনৈতিক দল। ঐতিহাসিকভাবে এ দেশের সব অর্জনেই দলটির ভূমিকা অতুলনীয়। দলের একজন কর্মী হিসেবে অবশ্যই বলতে পারি- বাংলাদেশের আর কোন রাজনৈতিক দলের মধ্যে এত গণতান্ত্রিক চর্চা নেই। দলের সভানেত্রী শেখ হাসিনার ওপর আমার পূর্ণ আস্থা রয়েছে। তিনি যেমন নেতৃত্ব বেছে নিবেন-সেটাই হবে সেরা। প্রবীণ ও তরুণদের মিশেলে আগামীর নেতৃত্ব নিয়ে আওয়ামী লীগ আরো এগিয়ে যাবে এমনটাই প্রত্যাশা করি।
পূর্বপশ্চিম: আজকাল টেলিভিশনে টক শো এবং সোশ্যাল মিডিয়া কেন্দ্রিক রাজনীতি দেখা যায়। নেতাকর্মীদের ওপর এর প্রভাব কি রকম?
নূরজাহান বেগম মুক্তা: সোশ্যাল মিডিয়ার মাধ্যমে রাজনীতি কথাটা আসলে অন্যভাবে নেয়ার সুযোগ নেই। ডিজিটাল বাংলাদেশের সুফল খালেদা জিয়া পর্যন্ত ভোগ করতেছেন। শেখ হাসিনার ডিজিটাল বাংলাদেশে তিনিও এখন ফেসবুক-টুইটার চালাচ্ছেন। কিন্তু এই ডিজিটাল বাংলাদেশের বিপক্ষে এমন হেন কথা বলতেও দ্বিধা করেননি খালেদা জিয়া। ইতিবাচকভাবে সোশ্যাল মিডিয়া এবং টক শো রাজনীতিকে গ্রহণ করার সময় এসেছে। কারণ আমার দলের রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি কর্মী এবং সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছানোর সবচে নির্ভরযোগ্য মাধ্যম হচ্ছে এগুলো। আর টক শোর মাধ্যমে নেতাকর্মীরা একটা বিষয় নিয়ে দ্বিধাদ্বন্দে থাকলেও ফোন করে জানতেও পারেন এবং তারা পরিষ্কার ধারণা নিতে পারেন কোন ইস্যুতে।
সূত্র : পূর্বপশ্চিম
