Wednesday, January 14সোনাগাজীর প্রথম অনলাইন পএিকা
Shadow

সাংবাদিকদের কয়েকটি গুরুত্বপূর্ন বৈশিষ্ট্য থাকা জরুরী

প্রকাশ- ১৫ সেপ্টেম্বর ২০১৬,

img_20160915_222029

সাংবাদিকতা করবো অথচ আইন সম্পর্কে কিছুই জানবো না

উল্লিখিত সংজ্ঞা দিয়ে চমৎকারভাবে বোঝা যায় সাংবাদিকতা কী এবং কাকে বলে! সাংবাদিকতা যে একটি যোগাযোগ প্রক্রিয়া সে ধারণাও স্পষ্ট হয় এই সংজ্ঞা থেকে। সমাজতত্ত্ববিদ চার্লস কুলী যোগাযোগের ধারণা দিয়েছেন এই বলে যে- ‘মানুষের পারস্পরিক সম্পর্ক যে ক্রিয়াকৌশলের মধ্য দিয়ে বজায় থাকে ও বিকশিত হয়, তা-ই যোগাযোগ।’

একজন সাংবাদিক এই যোগাযোগের বন্ধন তৈরি করেন সময়ের সাথে সময়ের, মানুষের সাথে মানুষের এবং তা’ টেনে নিয়ে যান প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে। এ কারণে সাংবাদিকতা একটি দায়িত্বশীল পেশা। আবার মহান পেশাও!

আর নিউজ বা সংবাদকে বলা হয় ‘ইতিহাসের প্রথম খসড়া’। আজ যা খবর, আগামীকাল তা’ ইতিহাস। সময়ের দলিল। যেমন ধরুন, জামাত যে মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিতা করেছে, তার অকাট্য প্রমাণ কোথায় পাওয়া যাবে ? এর প্রমাণ পাওয়া যাবে ’৭১-এর পত্রপত্রিকায়।

জামাত-এর দৈনিক পত্রিকার নাম ‘দৈনিক সংগ্রাম’। একাত্তরের সময়ও এটি ছাপা হতো। প্রতিদিনকার খবরে জামাতের তৎপরতার কথা, জামাত নেতাদের বক্তব্য ওই পত্রিকার কলামে কলামে লিপিবদ্ধ আছে। যে কেউ চাইলেই তা’ দেখতে পারেন। তখনকার খবরগুলোই আজ দলিল। ওই দলিলগুলিই সাক্ষ্য-প্রমাণ দিচ্ছে যে, জামাত মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিতাকারী। এটা একটা উদাহরণ দেয়া হলো মাত্র।

‘খবর’ বা ‘সংবাদ’ সময়কে ধরে রাখে পত্রিকার পাতায় পাতায়। যদিও অডিও-ভিডিও মাধ্যমও সেই একই কাজ করে। তবে সাধারণ মানুষের কাছে পত্রিকার কথাই বেশি উঠে আসে। তাই পত্রিকার কথা বলা! যে কোনো মাধ্যমের খবর বা সংবাদ এক সময় ইতিহাসের উপাদান হয়ে ওঠে। একজন সাংবাদিকের কাছে তাই খবরের বস্তনিষ্ঠতা দাবি করে। খবরের ’ভারসাম্য’ চায়। তা’ না থাকলে, খবরে পক্ষপাতিত্ব থেকে যায়। এতে করে সংবাদ মাধ্যমের প্রতি পাঠক-দর্শক-শ্রোতার আস্থাও কমে যায়। পরবর্তীতে সে সংবাদ মাধ্যম খুব দ্রুত কালের গর্ভে হারিয়ে যায়। কিন্তুু ইতিহাস গড়তে একজন সাংবাদিকের দায় অনেক বেশি হয়ে থাকে।

একজন সত্যিকারের সাংবাদিক মন যা চায়, তা’ লিখতে পারেন না। কারণ তিনি আইনের ঊর্ধ্বে নন। আবার তিনি বিবেকেরও ঊর্ধ্বে নন। তার লেখার দায়-দায়িত্ব তাকে বহন করা ছাড়াও পত্রিকার ওপরও সে দায় এসে পড়ে। সে জন্য একজন সাংবাদিককে সব সময় সতর্ক থাকতে হয়; সন্দেহ প্রবণ হতে হয়। তাকে ভাবতে হয়, তিনি যা লিখছেন, তা’ কী জনস্বার্থের পক্ষে? তার লেখার কারণে কোনো নির্দোষ ব্যক্তি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন না তো!

সাংবাদিকতা মহান পেশার একটি। যদি কেউ সাংবাদিক হতে চান, তবে তাকে মনে-প্রাণেই সাংবাদিক হতে হয়। মনে-প্রাণে সৎ থাকতে হয়! তারও আগে তাকে সত্যিকারের মানুষ হয়ে উঠতে হয়। নিজেকে ধর্ম, ব্যক্তিস্বার্থ, গোষ্ঠীস্বার্থের ঊর্ধ্বে রাখতে হয়। একটি নিরপেক্ষ অবস্থানে থেকে ঘটনা কিংবা খবরকে বিভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে বিচার করতে হয়। একজন সাংবাদিককে খবরের পেছনে আর কী কী বিষয় আছে, তা’ জানতে অক্লান্ত পরিশ্রম করতে হয়। আপাত সত্যি, সত্যি না-ও হতে পারে। এখন যা সত্যি বলে মনে হচ্ছে, পরবর্তীতে তা’ একেবারে মিথ্যাও প্রমাণিত হতে পারে। তাই একজন সাংবাদিককে খুব তীক্ষ্মধী হতে হয়। মন চাইলেই সাংবাদিক হওয়া যায় না। তার জন্য নিজেকে একটু একটু করে তৈরি করতে হয়। প্রকাশিত খবরের দায়-দায়িত্ব নেয়ার গুরুত্ব উপলব্ধি করতে হয়। নিজেকে মানবিক করে গড়ে তুলতে হয়। এ ব্যাপারে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নর্থ-ওয়েস্টার্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের সাংবাদিকতার অধ্যাপক কারটিস ডি ম্যাকডোগাল-এর কথা মনে পড়ে। তাঁর মতে, একজন যোগ্য সাংবাদিককে ২০টি গুণের অধিকারী হতে হয়। সেই গুণগুলো হচ্ছে-

১. তিনি হবেন বুদ্ধিমান;

২. তিনি হবেন সকলের প্রতি বন্ধুভাবাপন্ন। খিটমিটে মেজাজ, অহংকারী, গোমড়ামুখো, হামবড়া ও মারমুখী ব্যক্তিরা এ পেশার যোগ্য নন;

৩. তার কল্পনা শক্তি থাকবে। কিন্তু তা’ বলে তিনি কল্পনাপ্রবণ মন নিয়ে কোনো ফ্যান্টাসির রাজ্যে বাস করবেন না।

৪. তার থাকবে উদ্ভাবনী শক্তি। অবশ্য এর মানে এই নয়, তিনি অলীক কিছু উদ্ভাবন করবেন;

৫. তার নার্ভ খুব শক্ত হবে। কারণ তাঁকে কাজ করতে হবে যথেষ্ট প্রতিকূল অবস্থার মধ্য দিয়ে। ধরা যাক, যুদ্ধ-দাঙ্গা, দুর্ঘটনা এবং অফিসের প্রতিকূল পরিবেশ;

৬. তার কাজে ক্ষিপ্রতা থাকবে। কারণ তাঁকে নিদির্ষ্ট সময়ের ভেতর কপি শেষ করতে হবে। প্রচণ্ড স্পিডে কাজ করার দক্ষতা অর্জন না করলে তিনি প্রফেশন থেকে হঠে যাবেন। তিনি হবেন নির্ভুল। তাঁর লেখা পড়বে অথবা শুনবে লক্ষ লক্ষ লোক। তথ্যগত ভুল থাকলে তিনি হাস্যাস্পদ হবেন। তাঁর প্রতি ও তাঁর প্রতিষ্ঠানের প্রতি আস্থা কমে যাবে। কাজেই তাকে প্রতিটি তথ্য লেখার সময় সতর্ক হতে হবে;

৭. তিনি হবেন সাহসী। যিনি ভীরু প্রকৃতির- সাংবাদিকতা তাঁর জন্য নয়। তার জীবনে বিপদ ও ঝুঁকি প্রচুর। সাহসের সঙ্গে তার মোকাবেলা করতে হবে। বহুলোককে চটাতে হবে, বহু প্রভাবশালীর বিরাগভাজন হতে হবে। কিন্তু তাতে ভয় পেলে চলবে না;

৮. তাকে সহনশীল হতে হবে। সহ্য করতে হবে দৈহিক অত্যাচার। অসময়ে খাওয়া, অসময়ে নিদ্রা, ‘ভ্রমণং যত্র তত্র, শয়নং হট্টমন্দিরে’। এজন্য তার চাই উত্তম স্বাস্থ্য।

৯. তার চাই সংগঠন শক্তি। তিনি হবেন ব্যক্তিগত জীবনে একজন সুসংগঠিত মানুষ। পড়াশুনা, মেলামেশা, ব্যায়াম, মানসিক বিনোদন, কাজ ও গার্হস্থ্য জীবন এ সমস্ত কিছুর মধ্যে সমন্বয় করবেন তিনি। প্রফেশনাল জীবনেও তার চাই সংগঠন ক্ষমতা। তাকে কোনোকিছু হাতে তুলে দেবে না। তাকে স্বয়ং উদ্যোগী হয়ে সবকিছু গুছিয়ে তুলতে হবে।

ধরুন, একজন ভিআইপি-র অ্যাপয়েন্টমেন্ট চাওয়া- এ কাজটা তাকেই করে নিতে হবে। আবার একটি খবর করতে গেলে ১০-১২টি সূত্র থেকে তা’ সংগ্রহ করতে হবে। এ সব সূত্রের সংগে যোগাযোগ রাখা তারই দায়িত্ব। তিনি ফটোগ্রাফারকে নির্দেশ দেবেন। ডিসপ্লে সম্পর্কেও, প্রয়োজন হলে আলোচনা করবেন এবং গুরুত্বপূর্ণ কপি হলে প্রুফও দেখে দেবেন। শুধু তাই নয়, প্রকাশিত খবরের ‘ফলো-আপও তাকে করতে হবে;

১০. তাকে ধৈর্যশীল হতে হবে। বার বার ব্যর্থ হলেও তাকে হাল ছাড়লে চলবে না। ‘পেলাম না’ বা ‘হলো না’ অথবা ‘করতে পারলাম না’বলে সাংবাদিকদের অভিধানে কোনো শব্দ নেই;

১১. মানসিক সতর্কতা হবে তার সবচেয়ে বড় গুণ। আইনসভার কিংবা কোনো জনসভার অনেক ক্লান্তিকর একঘেঁয়ে ভাষণের মধ্যে হঠাৎ কোনো একটি মন্তব্য বা বক্তব্য সংবাদ হিসেবে অমূল্য হয়ে উঠতে পারে। অথবা যাতায়াতের পথে বাসে, ট্রেনে, প্লেনে এমন কী পথের মোড়ে হঠাৎ কোনো খবর জন্ম নিতে পারে;

১২. সাংবাদিককে সৎ হতে হবে। সাংবাদিকতার পথ পিচ্ছিল ও প্রলোভনের পথ। তাকে জয় করা ইন্দ্রিয় জয়ের চেয়েও কঠিন ও মহৎ;

১৩. নিয়মানুবর্তিতা তার আর এক গুণ। যেখানে প্রয়োজন ঠিক নির্দিষ্ট সময়ে সেখানে তিনি হাজির হবেন। নচেৎ অন্যের মুখ থেকে শুনে বিবরণ লিখলে তিনি অনেক কিছু ‘মিস’করবেন;

১৪. তাকে সব সময় সহাস্য বদন থাকতে হবে। সাংবাদিক তাঁর সরস ব্যক্তিত্বের দ্বারা সকলকে আকৃষ্ট করবেন। তিনি জীবন বিমুখ নন জীবনবাদী;

১৫. তার থাকবে পর্যবেক্ষণ ক্ষমতা। সাংবাদিক এক বিশ্লেষণী ক্ষমতার অধিকারী হবেন। সমস্ত কিছু পর্যবেক্ষণ করে ভালোমন্দ উভয় দিক বিশ্লেষণের ক্ষমতার তাঁর সহজাত হওয়া উচিত;

১৬. সাংবাদিককে হতে হবে কূটবুদ্ধিসম্পন্ন। তিনি বুদ্ধিমান হবেন কিন্তু তাঁকে বহুক্ষেত্রে কুটিল হতে হবে। অবস্থা বুঝে ব্যবস্থা নিতে হবে এবং সংবাদ সংগ্রহের জন্য প্রয়োজন মতো রণকৌশল বদল করতে হবে;

১৭. তিনি একজন রসিক হবেন। অন্তত তার উঁচু দরের রসবোধ থাকা চাই;

১৮. তার থাকা চাই মানিয়ে চলার ক্ষমতা। বিভিন্ন মানুষের সঙ্গে এবং বিভিন্ন অবস্থার সংগে তাকে মানিয়ে চলতে হবে;

১৯. তাকে উদ্যোগী হতে হবে;

২০. তাকে এমন ব্যক্তিত্ব গড়ে তুলতে হবে, যাতে লোকে তাঁকে পছন্দ করে। অধ্যাপক কারটিস ম্যাকডোগাল-এর মতামতগুলো বিচার বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় যে, একজন সত্যিকারের সাংবাদিককে কতখানি গুরুদায়িত্ব পালন করতে হয়! সত্যিকারের সাংবাদিকতা সত্যিই একটি কঠিন বিষয়!

এ ছাড়াও একজন সাংবাদিককে সবসময় নিজের বিবেকের কাছেও জবাবদিহি থাকতে হয়। বিবেকের কাছে দায়বদ্ধ থাকলে একজন সাংবাদিক তার সাংবাদিকতার দায়-দায়িত্ব নিতে সক্ষম হয়ে ওঠেন।

সাংবাদিকের অধিকার বলতেও একটা কথা আছে। সে অধিকার হচ্ছে, সত্য প্রকাশের অধিকার। সত্য প্রকাশে তিনি হবেন অবিচল! কিন্ত সাংবাদিক কি তথ্য গোপন করবেন? তথ্য বিকৃত করবেন? এক কথায় এর উত্তর হচ্ছে, নাহ্! তা’ তিনি পারেন না। সাংবাদিকতা একটি স্বাধীন পেশা। এ পেশা গ্রহণ করতে কোনো ধরনের ‘লাইসেন্স’-এর প্রয়োজন পড়ে না। তাই তথ্য বিকৃতি কিংবা তথ্য গোপন করার জন্য তার লাইসেন্স বাতিলের কোনো প্রশ্নই আসে না। কিন্তু একজন আইনজীবীর, ডাক্তারের তার পেশায় আসতে লাইসেন্স-এর দরকার পড়ে। একজন আইনজীবী কিংবা একজন ডাক্তার ভুল করলে, অভিযুক্ত হলে তার লাইসেন্স বাতিল হতে পারে। লাইসেন্স লাগে না বলে. একজন সাংবাদিকের দায় অনেক বেশি। সমাজ তার কাছ থেকে অনেক বেশি দায়িত্বশীল আচরণ আশা করে। অধিকারের প্রশ্নে কখনো কখনো একজন সাংবাদিককে ‘সেল্ফ সেন্সরড্’(Self-censored) হতে হয়। সত্য প্রকাশে তাকে অন্যদের চেয়ে অনেক বেশি ধৈর্যশীল এবং বস্তুনিষ্ঠ হতে হয়।

‘নৈতিকতা’? সেটি আরো অনেক বড় ব্যাপার! নৈতিকতা ছাড়া একজন সাংবাদিক সাংবাদিক হওয়ার যোগ্যতাই রাখেন না। সাংবাদিকের অস্ত্র- কলম। তিনি যা ইচ্ছা, তা-ই লিখতে পারেন। এ ব্যাপারে তিনি স্বাধীন! কিন্তু স্বাধীনতা মানে যথেচ্ছাচার নয়। তাকে দেশের আইন, সংস্কৃতি, রুচি মাথায় রেখে কলম ধরতে হয়। এর সাথে আরো একটা প্রশ্ন জড়িত। সেটি হচ্ছে, মানবিক বোধের বাইরে তিনি কিছুই করতে পারেন না। একজন মানবিক বোধসম্পন্ন মানুষই কেবল সাংবাদিক হওয়ার যোগ্যতা রাখেন। এ ব্যাপারে প্রেস কাউন্সিল প্রণীত আচরণ বিধি উল্লেখ করা যেতে পারে।

। ইতিহাস তৈরির দায়-দায়িত্ব-ই একজন সাংবাদিককে অধিকতর দায়িত্বশীল করে তুলতে পারে বলে সবাই বিশ্বাস করেন। একজন সাংবাদিককে অবশ্যই তা’ সব সময় মনে রাখতে হবে। পূর্বসূরীদের কাজ অন্তত সেই কথাই আমাদের মনে করিয়ে দেয়!!

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *