Wednesday, January 14সোনাগাজীর প্রথম অনলাইন পএিকা
Shadow

সোনাগাজীর মজলুম জননেতা গরীবের বন্ধু ইন্তু মিয়া

 

10644342_1066194273401046_4650824725483866584_o-250x300

 

২৫ সেপ্টেম্বর ১৬

 

গিয়াস উদ্দিন লিটন >>১৯৪৫ সালে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ডামাডোলে পড়ে অত্রাঞ্চলে এক ভয়াবহ দুর্ভিক্ষ দেখা দেয় । সচ্ছল মানুষের দরজায় ভাতের ফেন নিতে আসা মানুষের লাইন দীর্ঘ হতে থাকে ।

দুর্ভিক্ষ দীর্ঘস্থায়ী হতে থাকলে সচ্ছল মানুষদেরও আর ফেন বিতরণের উপায় থাকেনা । পেটের ক্ষুধায় অস্থির দরিদ্র জনগোষ্ঠী কলাগাছের ভিতরের নরম অংশ , সেদ্ধ কচু ও শাক,

ঘাস সেদ্ধ করে খেয়ে বাঁচার চেষ্টা করে । নিরন্ন মানুষ , মাসুম বাচ্চাদের হাহাকার আর কঙ্কালসার দেহের দিকে তাকিয়ে গুমরে কাঁদেন একজন জনদরদি। তিনি রফিক উদ্দিন আহমেদ ইন্তু মিয়া।

ভাবেন এদের জন্য কিছু একটা করা দরকার । সরকারী বিভিন্ন মহলে দৌড়ঝাঁপ করে কিছু রিলিফ সংগ্রহ করেন ।

মহকুমা প্রশাসকের কার্যালয় থেকে পাশ করান সপ্তাহে এক বস্তা আটা। ফেনী জেলার দক্ষিনে কুটির হাটে চালু করেন লঙ্গর খানা। ভাত খাওয়া তখন বিলাসিতা । দুর্ভিক্ষ পীড়িত মানুষকে অন্তত দৈনিক এক বেলা যেন আটার ‘জাউ‘ খাওয়াতে পারেন সে ব্যবস্থা করতে গিয়ে দুশ্চিন্তায় নির্ঘুম রাত কাটান ইন্তু মিয়া ।

দুর্ভিক্ষ দির্ঘায়ীত হতে থাকলে সরকারী ত্রাণ আর সচ্ছল মানুষদের সহযোগিতা অপ্রতুল হয়ে দেখা দেয় । রিলিফ ব্যবস্থা নিরবচ্ছিন্ন রাখতে ইন্তু মিয়া বিক্রি করে দেন নিজের হালের গরু ,

পৈতৃক জমি জমা ।

বিক্রীত অর্থ বিলিয়ে দেন ‘জাউ‘এর পিছনে । পীড়িতের সাথে একাত্মতা প্রকাশ করে নিজেও এক বেলা ‘জাউ‘ খেয়ে দিন কাটান । ঘোষণা দেন , ”যদি দুর্ভিক্ষে এই অঞ্চলের লোক মরা শুরু হয় ,

তাহলে প্রথমে মরবে এই রফিক উদ্দিন।”

তাঁর ঘোষণায় শত দুঃখের মাঝেও উল্লাসে ফেটে পড়ে জনতা । গরীবের সাথে এমন একাত্ব হতে অতীতে তারা এমন কাউকে দেখেন নি ।

সেই থেকে মানুষ ইন্তু মিয়াকে হৃদয়ে স্থান দেন

”গরীবের বন্ধু” হিসেবে ।

”গরীবের বন্ধু” ইন্তু মিয়া ১৯০৯ সালে ফেনী মহকুমার সোনাগাজী থানার ২ নং বগাদানা ইউনিয়নের হালিয়া গ্রামে এক সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে জন্মগ্রহন করেন । পিতার নাম করিম বক্স ।

তিনি মঙ্গলকান্দি উচ্চবিদ্যালয় থেকে ১৯২৫ সালে এন্ট্রান্স (এস এস সি) পাশ করেন । ফেনী কলেজে এইচ এস সি অধ্যায়নরত অবস্থায় মুসলিম লীগের রাজনীতির সঙ্গে জড়িয়ে পড়েন ।

নেতৃত্বগুণে অল্প দিনেই তিনি ফেনী মহকুমা মুসলিম লীগের সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন । ১৯৪০ সালে তিনি নিজ এলাকায় ইউ পি সদস্য নির্বাচিত হন । একই সময়ে তিনি ইউপি রিলিফ কমিটির সেক্রেটারির দায়িত্ব পালন করেন ।

দুর্ভিক্ষ পরবর্তী ১৯৪৭ সালে ইন্তু মিয়ার এলাকায় মহামারী আকারে কলেরা দেখা দেয় । তৎকালে কলেরা ছিল মারাত্মক সংক্রামক রোগ ।

কলেরা রোগীর সংস্পর্শে যারা আসতো তারা তাৎক্ষণিক আক্রান্ত হত । দেখা জেতো কোন কলেরা রোগীকে দাফন করে যারা বাড়ী গিয়েছে

, পরের দিন তাদেরও জানাজা হয়ে গিয়েছে ।

পরিস্থিতির অত্যান্ত অবনতি ঘটে যখন দেখা যায় পরিবারের কোন সদস্য কলেরায় আক্রান্ত হলে রোগীকে গরু ঘর বা ঢেঁকী ঘরে ফেলে রাখা হত । পারত পক্ষে তার সংস্পর্শে কেউ আসতো না । পরিবারে সদস্যদের যখন এই অবস্থা তখন কলেরা রোগীর প্রতি প্রতিবেশীদের আচরণ কেমন ছিল তা সহজেই অনুমেয় ।এমতাবস্থায় মৃতের দাফন

,কাফন , কবর খোঁদা বা জানাজা পড়ানোর লোক পাওয়া অত্যন্ত দুস্কর হয়ে পড়েছিলো ।মানুষের এই দুঃসময়ে স্থির থাকতে পারেন না ইন্তু মিয়া । মৃতকে রেখে যেখানে তার আত্মীয় স্বজনই পালিয়ে যাচ্ছে , সেখানে দেবদূতের ছুটে গেছেন তিনি । রোগীকে নিজ হাতে সেবা করেছেন ,

কিনে দিয়েছেন ওষুধ পথ্য ।

কেউ মারা গেলে লাশ ধোয়ানো থেকে কাফন পরানো এমন কি কবরটাও নিজে খুদে মৃতের সৎকার করেছেন । অনেক সময় জানাজায় তিনজন মানুষ হাজির করতেও উনাকে হিমশিম খেতে হয়েছে ।

স্থানীয় অশীতিপর এক মুরুব্বী জানান , ওই সময়ে কলেরায় সহস্রাধিক লোক মারা যায় ।

আল্লাহ্র রহমত আর বিজ্ঞানীদের অক্লান্ত প্রচেষ্টায় কলেরা নামক ভয়ঙ্কর দানবকে এখন

”ডায়রিয়া” নামক বোতলে বন্দি করে ফেলা হয়েছে । তাই প্রবীণ ব্যক্তিরা ছাড়া তখনকার কলেরার ভয়াবহতা অন্যদের পক্ষে অনুমান করা সম্ভব নয় ।

এক দিন ঝড় থেমে ইন্তু মিয়ার পৃথিবী আবার শান্ত হয় । থামে দুর্ভিক্ষ আর কলেরায় পাগলা দানব ।

এর পর ১৯৪৬ সালে আসে প্রেসিডেন্ট নির্বাচন (ইউপি) । ১ নং কুটির হাট ইউনিয়নের প্রেসিডেন্ট প্রার্থী হন ইন্তু মিয়া ।

মানুষের দুর্দিনে ,দুঃসময়ে যে পাশে দাঁড়ায় সেইতো আপন জন । মানুষ তাদের আপন জনকে চিনতে ভুল করেনা । তারা বিপুল ভোটে নির্বাচিত করে রফিক উদ্দিন ইন্তু মিয়াকে । নির্বাচিত হয়ে এলাকার উন্নয়নের পাশাপাশি তিনি জাতীয় বিভিন্ন ইস্যুতে অগ্রণী ভূমিকা পালন করেন । ভাসানীর অন্যতম সহচর হিসাবে চষে বেড়ান বাংলাদেশ থেকে আসাম ।

১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনে তিনি ছিলেন নোয়াখালী অঞ্চলের অন্যতম সংগঠক ।১৯৫৩ সালে নোয়াখালী জেলা বোর্ডের নির্বাচনে অংশ নিয়ে তিনি সামান্য ভোটে হেরে যান । ১৯৫৪ সালে পাকিস্তান গণ পরিষদ নির্বাচনে যুক্তফ্রন্টের প্রার্থী হিসাবে সংসদ সদস্য পদে নির্বাচন করেন । এখানেও অল্প ভোটের ব্যবধানে তিনি দ্বিতীয় হন ।

ফেনীর দক্ষিণের মানুষ ইন্তু মিয়ার কাছ থেকে নির্বাচন উপলক্ষে এক কাপ চা খাওয়াকেও হারাম মনে করতো । কিন্তু জেলাবোর্ডের বা সংসদ সদস্যের এরিয়া ছিল বিশাল ।তখনকার নির্বাচনে টাকা পয়সার এত ছড়াছড়ি না থাকলেও ন্যুনতম যাতায়াত ভাড়া , সঙ্গীদের চা নাস্তার জন্যও কিছু টাকার প্রয়োজন ছিল । যা জনকল্যাণে নিঃস্ব হয়ে যাওয়া ইন্তু মিয়ার ছিলনা ।এই আর্থিক অপ্রতুলতাই পর পর দুটি ভোটে ইন্তু মিয়ার সামান্য ভোটে হেরে যাওয়ার অন্যতম কারন ছিল বলে মানুষের ধারনা ।

১৯৭১ সালের স্বাধীনতা যুদ্ধে ইন্তু মিয়া ছিলেন একজন গেরিলা সংগঠক মুক্তিযোদ্ধা । কোন সুযোগ সুবিধা বা ফায়দা হাসিলের জন্য নয় , তিনি যুদ্ধ করেছেন দেশের জন্য । তাই জীবদ্দশায় মুক্তিযোদ্ধার তালিকায় নাম উঠানোর কোন তদ্বির করেন নি । সরকার থেকেও তালিকায় উনার নাম উঠানো হয়নি । জনশ্রুতি আছে ,অনুরূপ মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক এ,বি,এম তালেব আলী সাহেবের নামও নাকি মুক্তিযোদ্ধার তালিকায় নেই ।

স্বাধীনতার পর দেশে অনুষ্ঠিত প্রথম ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে ইন্তু মিয়া ২ নং বগাদানা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন ।উত্তাল স্বাধীনতা যুদ্ধ সবে শেষ হয়েছে । দেশ তখনো স্থিতিশীল হয়নি । চারিদিকে লুটপাটের মহোৎসব ।রিলিফ সামগ্রী আর লুটপাটে আঙ্গুল ফুলে কলাগাছ হওয়ার প্রতিযোগিতায় লিপ্ত মেম্বার , চেয়ারম্যান আর আমলারা ।গরীবের বন্ধু ইন্তু মিয়া এসবের ব্যতিক্রম । গরীবের রিলিফের এক মুঠো গমও যেন বেহাত না হয় সেদিকে তাঁর সজাগ দৃষ্টি ।

জুত করতে পারেন না দুর্নীতিবাজ মেম্বার আর আমলারা । তারা পিছে লাগেন ইন্তু মিয়ার । যে লোক নিজেও খায় না , তাদেরও খেতে দেয় না

,এমন চেয়ারম্যান তাদের দরকার নাই । তারা একযোগে অনাস্থা দেয় ইন্তু মিয়ার বিরুদ্ধে । কেড়ে নেয়া হয় তাঁর চেয়ারম্যান পদ ।এর পরও শত্রুরা বসে থাকে নি । না না অপপ্রচার আর মামলা দিয়ে নির্যাতন চালিয়ে যান ইন্তু মিয়ার উপর ।

এক দিন ফেনী রাজাজির দিঘীর পাড়ে বসে গল্প করছিলেন ইন্তু মিয়া । চক্রান্ত কারীরা সন্তর্পণে তাঁর পাঞ্জাবীর পকেটে বুলেট ঢুকিয়ে দিয়ে তাঁকে পুলিশে ধরিয়ে দেন ।

পরে আদালতের রায়ে তিনি বে-কসুর প্রমানিত হন ।

পরের সেবায় আত্মোৎসর্গকারী জনদরদী জননেতা ছিলেন ইন্তু মিয়া । এমন নেতার স্মৃতিকে ধরে রাখার কোন উদ্যোগ নেয়নি সমাজ বা প্রশাসন ।

”ইন্তু মিয়া বৃত্তি ফাউনডেশন” নামে একটি সংগঠনের অস্তিত্ত জানা যায় । এটা কারা চালান তা ইন্তু মিয়ার পরিবারের কোন সদস্য জানেন না । এই ফাউনডেশন এর সাথে যুক্ত হওয়ার মত যথাযথ যোগ্যতা রাখেন, ইন্তু মিয়ার এমন উত্তরাধিকারীরা রয়েছেন । তা সত্ত্বেও তাঁদের কাউকে এই সংগঠনের সাথে যুক্ত না করায় ”ইন্তু মিয়া বৃত্তি ফাউনডেশন” এর কার্যক্রমকে সন্দেহের উর্ধে রাখছেন না তাঁরা ।

”যেই সমাজে গুণীর কদর হয়না , সেই সমাজে গুণী জন্মায়না ।” বরেণ্য এই রাজনীতিবিদ জীবদ্দশায় প্রাপ্য মর্যাদা বা কদর পাননি । মৃত্যুর পরে হলেও এই গুণী মানুষটির স্মৃতিকে ধরে রাখা দরকার ।

এই লক্ষ্যে মরহুম রফিক উদ্দিন আহমেদ ইন্তু মিয়ার স্মৃতি বিজড়িত কুটির হাট বাজারকে ”ইন্তু মিয়ার বাজার” নামকরণ করে তাঁর স্মৃতিকে ধরে রাখার চেষ্টা করা যেতে পারে । কিংবা নামকরন করা যেতে পারে কোন সড়ক , স্কুল বা মিলনায়তনের ।

মহীয়সী তাজুন্নেসা বেগম ছিলেন ইন্তু মিয়ার সহ ধর্মিণী । তিনি ১৯৩৮ সনের এস এস সি পাশ ছিলেন ।

তাঁরা ৩ পুত্র আর এক কন্যার জনক জননী ছিলেন । ইন্তু মিয়ার আদর্শকে বুকে লালন করে উনার পুত্র-কন্যা,নাতী-নাতনীরাও সুনাগরিক হিসাবে সমাজে অবদান রেখে যাচ্ছেন । এই বর্ষীয়ান জননেতা ১৯৯৯ সালের ১১ই এফ্রিল ইন্তেকাল করেন । তাঁর রূহের মাগফেরাত কামনা করছি ।।

লেখক: গিয়াস উদ্দিন লিটন,অনলাইন অ্যাকটিভিস্ট

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *