Tuesday, January 13সোনাগাজীর প্রথম অনলাইন পএিকা
Shadow

শালা মালাউন, হিন্দুকা লাড়কা! তোমহারা মুজিবর বাবা আভি কাহা হায়?

mukti-joddar-dolil

১২ অক্টোবর ১৬
সোনাগাজীর আলো ডেস্ক:-১৯৭১ সনের ২৫শে মার্চ আমি সারাদিন থানা সংলগ্ন পুলিশের সি, আই, অফিসের জন্য কাজ করছিলাম। রাত দশটা পনের মিনিট। আমার টেবিলের উপর রাখা টেলিফোনটি বেজে উঠল। কমলাপুর পুলিশের জি, আর, পি থেকে আমার এক বিশিষ্ট বন্ধু টেলিফোনে আমাকে জানালো যে, ঢাকা সেনানিবাস থেকে ভারী অস্ত্র ও কামান সেট করা সত্তরটি আর্মি ট্রাক ভর্তি সশস্ত্র পাক হানাদার এয়ারপোর্ট রোড ধরে ঢাকা শহরে প্রবেশ করছে। রাত প্রায় এগারোটার সময় পাক হানাদাররা আমাদের থানার উপর আক্রমন করে। ওরা এসেই ভারী মেশিনগানের সাহায্যে বৃষ্টির মত আমাদের থানায় গুলি বর্ষণ করতে থাকে। থানার সামনে নিয়োজিত আমাদের সশস্ত্র প্রহরী ও কতিপয় পুলিশ অফিসার পশুদের অবিরাম গুলিবর্ষণে বেশীক্ষণ টিকে থাকতে পারে নাই। পাক সেনারা থানায় ঢুকেই তাদের সবাইকে বন্দী করে। এরপর বহু পাক সেনা আমাদের দিকে গুলি বর্ষন করতে করতে অগ্রসর হতে থাকলে আমরা গুলিবর্ষন শুরু করি এবং প্রাণপণে পশুদের প্রতিরোধ করতে থাকি। এভাবে আমরা সারারাত শত্রুসেনাদের প্রতিরোধ করতে থাকি। সকালে সাড়ে পাঁচটায় ওরা থানার কলোনী সশস্ত্র ভাবে ঘেরাও করে ব্যাপক তল্লাশী আরম্ভ করে এবং আমাদের সবাইকে বন্দী করে। আমরা থানায় পুলিশের সাধারণ সিপাহী, উচ্চপদস্থ পুলিশ অফিসারসহ মোট ৪৫ জন ওদের হাতে বন্দী হয়েছিলাম। আমাদের সাথে বাইরের আরও ৫০ জন পুলিশ বন্দীকে রাখা হয়েছিল। আমাদের সবাইকে থানার সম্মুখে পশ্চিম দিকে মাঠে বেদম প্রহার করতে করতে, বুটদ্বারা লাথি মারতে মারতে নিয়ে গিয়ে “নজর নিচে দেকার মিটেট মে শো যাও” বলে আমাদেরকে উপড় করে লাথি মেরে শুইয়ে দেয়া হয়। সকাল ছয়টা থেকে নয়টা পর্যন্ত তিন ঘন্টা আমাদেরকে বেদম পিটানো হয়। হাতের বেত, বন্ধুকের নল এবং যার হাতে যা ছিল তাই দিয়ে আমাদের উপর এলোপাতাড়ি পিটুনি চলতে থাকে। “শালা মালাউন, শোয়ার কা বাচ্চা আভী জয় বাংলা বলতা নাই, শালা কাফের, হিন্দুকা লাড়কা, তোমহারা মুজিবর বাবা আভি কাহা হায়?” বলে অকথ্য গালাগালি করতে থাকে আর অবিরামভাবে প্রহার করতে থাকে। আমার ঘরে নৌকার সুন্দর আর্ট করা গ্রাম বাংলার একটি দেয়াল চিত্র দেখে আমাকে আরও বেশি প্রহার করতে থাকে। আমাদের সি, আই, মিঃ মোয়াজ্জেম হোসেন, লজ্জায় এবং অপমানে বিমুঢ় হয়ে সারাদিন হাউমাউ করে পাগলের মত কাঁদতে থাকেন। তার দু’ছেলেও তার সাথে বন্দী হয়ে চরম অত্যাচারের শিকার হয়েছিল। তিন ঘন্টা থানার সামনের মাঠে বেদম পিটুনি দেওয়ার ফলে আমাদের বহু সহকর্মী জ্ঞান হারিয়ে ফেলেছিলেন। কারো মুখ দিয়ে রক্ত পড়ছিল, কারো কারো হাত পা ভেঙ্গে গিয়েছিল। এরপর আমাদের প্রায় ৪০ জনকে এলোপাতাড়ি পিটাতে পিটাতে থানার একটি আট ফুট প্রশস্ত ও দশ ফুট চওড়া ছোট কামরায় ঠাসাঠাসি করে চাউলের বস্তার মত গুদামজাত করে রাখা হয়। আমরা বেদমভাবে প্রহৃত হওয়ার পর থানার সম্মুখে প্রাঙ্গনে মানুষের তাজা রক্তে ভরপুর দেখেছি। আমাদের থানা হাজতে একজন আসামী ছিল তাকেও গুলি করা হয়। কিন্তু সে মরে নাই, আধমরা ভাবে ভীষণ যন্ত্রণায় কাতরাচ্ছিল। আমরা ছোট কামরায় প্রবেশ করার সময় দেখলাম আমাদের দু’জন শহীদ সিপাহীর লাশ থানার পিছনের মাটিতে পোতা হচ্ছে। সারারাত আমরা সকল সিপাহী বন্দী দাঁড়িয়ে থেকে যন্ত্রণায় কেঁদেছি, সাংঘাতিক যন্ত্রণা ভোগ করেছি। ওরা মেশিনগান নিয়ে সর্বক্ষন প্রহরায় ছিল।
.
রমনা থানার সাব-ইন্সপেক্টর অব পুলিশ, মতিউর রহমানের সাক্ষাৎকারে অংশবিশেষ। বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধঃ দলিলপত্রের অষ্টম খন্ডের (১২-৬৬) নং পৃষ্ঠায় সংকলিত ইতিহাস।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *