
নিজস্ব প্রতিবেদক:,১৪ নবেম্বর ১৬।।০৫:৩০:৪৩
ফেনী জেলা আওয়ামীলীগের সাধারন সম্পাদক ও সদরের সাংসদ নিজাম উদ্দিন হাজারীর বিরুদ্ধে জেলা যুবলীগের সাবেক যুগ্ন আহবায়ক শাখাওয়াত হোসেনর দায়ের করা রিট মামলার রায়ের তারিখ ২২ নবেম্বর ধার্য করেছে হাইকোর্টের একটি বেঞ্চ।
নিজাম হাজারীর ফেনী-২ আসনের সংসদ সদস্য পদে থাকার বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে যে রিট আবেদন হয়েছিল, ওই দিন তার রায় দেবে হাই কোর্ট।
এ বিষয়ে দুই বছর আগে হাই কোর্ট যে রুল দিয়েছিল, তার ওপর শুনানি শেষে সোমবার বিচারপতি মো. এমদাদুল হক ও বিচারপতি মো. ইকবাল কবিরের বেঞ্চ রায়ের এ দিন ঠিক করে দেয়।
এ মামলায় এর আগেও একবার রায়ের জন্য তিন দফা তারিখ দিয়েছিল আদালত। কিন্তু কারাগারে ‘রক্তদান করে’ নিজাম হাজারী কারাবাস রেয়াতের অধিকারী হয়েছেন বলে তার আইনজীবীরা যুক্তি দিলে রায় আটকে যায়।
রক্তদানের হিসাব ও অন্যান্য বিষয়ে দুই পক্ষের শুনানি শেষে হাই কোর্ট সোমবার রায়ের জন্য নতুন তারিখ নির্ধারণ করে।
নিজাম হাজারীর পক্ষে এ মামলা লড়েন ব্যারিস্টার শফিক আহমেদ ও নুরুল ইসলাম সুজন এমপি। আদালতে রিট আবেদনকারী পক্ষে শুনানি করেন আইনজীবী এম কামরুল হক সিদ্দিকী।
ফেনী জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক নিজাম হাজারী ২০১৪ সালের নির্বাচনে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন।
‘সাজা কম খেটেই বেরিয়ে যান সাংসদ’ শিরোনামে ২০১৪ সালের ১০ মে একটি জাতীয় দৈনিকে প্রকাশিত প্রতিবেদন যুক্ত করে তার ওই পদে থাকার বৈধতা নিয়ে ফেনী জেলা যুবলীগের সাবেক যুগ্ম আহ্বায়ক সাখাওয়াত হোসেন ভূঁইয়া রিট আবেদনটি করেন।
রিট আবেদনকারীর যুক্তি, সংবিধানের ৬৬ (২) (ঘ) অনুচ্ছেদ অনুসারে, কোনো ব্যক্তি যদি নৈতিক স্খলনজনিত কোনো ফৌজদারি অপরাধে কমপক্ষে দুই বছরের কারাদণ্ডে দণ্ডিত হন তাহলে মুক্তির পর পাঁচ বছর অতিবাহিত না হওয়া পর্যন্ত তিনি সংসদের সদস্য নির্বাচিত হওয়ার এবং সংসদ সদস্য থাকার যোগ্য হবেন না।
২০০০ সালের ১৬ অগাস্ট অস্ত্র আইনের এক মামলায় দুটি ধারায় ১০ বছর ও সাত বছর কারাদণ্ড হয় নিজাম হাজারীর, যা আপিলেও বহাল থাকে।
সে হিসেবে নিজাম হাজারী ২০১৫ সালের আগে সংসদ সদস্য পদে নির্বাচিত হওয়ার যোগ্য না হলেও তিনি ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির নির্বাচনে সাংসদ হয়ে যান বলে অভিযোগ করা হয় রিট আবেদনে।
প্রাথমিক শুনানি নিয়ে ২০১৪ সালের ৮ জুন বিচারপতি মির্জা হোসেইন হায়দার ও বিচারপতি মুহাম্মদ খুরশীদ আলম সরকারের হাই কোর্ট বেঞ্চ এ বিষয়ে রুল জারি করে।
নিজাম হাজারী কোন কর্তৃত্ববলে ওই আসনে সংসদ সদস্য পদে আছেন এবং ওই আসনটি কেন শূন্য ঘোষণা করা হবে না- তা জানতে চাওয়া হয় রুলে৷ পাশাপাশি অন্তর্বর্তীকালীন নির্দেশনাও দেয় আদালত।
ওই রুলের উপর শুনানি গ্রহণে গতবছরের ১২ নভেম্বর হাই কোর্টের একটি দ্বৈত বেঞ্চের এক বিচারপতি এবং পরে ২ ডিসেম্বর অন্য একটি দ্বৈত বেঞ্চ বিব্রতবোধ করে।
প্রধান বিচারপতি এরপর বিষয়টি শুনানির জন্য বিচারপতি মো. এমদাদুল হকের নেতৃত্বাধীন দ্বৈত বেঞ্চে পাঠান। চলতি বছরের ১৯ জানুয়ারি হাই কোর্টে রুলের উপর শুনানি শুরু হয়।
শুনানিকালে ৩০ মার্চ হাই কোর্ট নিজাম হাজারীর কারাবাসের সময় ও রেয়াতের বিষয়ে প্রতিবেদন দিতে কারা কর্তৃপক্ষকে নির্দেশ দেয়। সেইসঙ্গে নিজাম হাজারীর বিরুদ্ধে অস্ত্র আইনে করা মামলার রায় ও নথিপত্র ৩০ দিনের মধ্যে দাখিল করতে বলে।
এরপর ২৬ মে অপর এক আদেশে হাই কোর্ট অস্ত্র মামলায় নিজাম হাজারীর কারাবাসের সময় ও রেয়াতের বিষয় তদন্ত করে আদালতে প্রতিবেদন দাখিল করতে কারা মহাপরিদর্শককে (আইজি-প্রিজন্স) নির্দেশ দেয়।
সহকারী অ্যাটর্নি জেনারেল আমিনুর রহমান চৌধুরী টিকু বলেন, প্রথম প্রতিবেদনটি জমা পড়ার পর তাতে কিছু অষ্পষ্টতা থাকায় নিজাম হাজারীর সাজা ভোগ ও রেয়াত বিষয়ে তদন্ত করে প্রতিবেদন দিতে আইজি-প্রিজন্সকে নির্দেশ দেওয়া হয়।
এ নির্দেশনা অনুসারে আইজি-প্রিজন্সের দেওয়া প্রতিবেদন ১৯ জুলাই আদালতে দাখিল করে রাষ্ট্রপক্ষ। সেখানে বলা হয়, ১০ বছরের সাজার মধ্যে নিজাম হাজারী সাজা খেটেছেন ৫ বছর ৮ মাস ১৯ দিন। কারা কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে সাজা রেয়াত পেয়েছেন ১ বছর ৮ মাস ২৫ (৬২৫ দিন)। রেয়াতসহ মোট সাজা ভোগ করেছেন ৭ বছর ৫ মাস ১৪ দিন। এখনো সাজা খাটা বাকি আছে ২ বছর ৬ মাস ১৬ দিন।
গত ৩ অগাস্ট এই রিটের রুলের ওপর শুনানি শেষ করে আদালত ১৭ অগাস্ট রায়ের দিন ঠিক করে দিলেও ওইদিন নতুন একটি নথি চাওয়া হলে রায়ের তারিখ পিছিয়ে যায় ২৩ অগাস্ট।
কিন্তু ২৩ অগাস্ট আদালতে ফের শুনানিতে অংশ নেন আইনজীবীরা। ‘রক্তদান করে’ নিজাম হাজারী কারাবাস রেয়াতের অধিকারী হয়েছেন বলে তার আইনজীবীরা সেদিন আদালতে যুক্তি দেন।
শুনানির পর আদালত রায়ের জন্য ৩০ অগাস্ট দিন রাখে। সেদিন রায় দেওয়া শুরুও হলেও মাঝখানে মুলতবি করে পরদিন রায়ের বাকি অংশ দেওয়ার কথা জানানো হয়। এরপর বিষয়টি পিছিয়ে যায় নভেম্বর পর্যন্ত।
হাজারীর আইনজীবী নুরুল ইসলাম সুজন সেদিন বলেন, নিজাম হাজারী কারাগারে থাকার সময় মোট ১৩ বার রক্ত দিয়েছিলেন। যার বিপরীতে তিনি ৪৮৬ দিনের কারাবাস থেকে রেয়াত পাওয়ার অধিকারী হয়েছেন। এটা ধরা হলে তার সাজার মেয়াদের চেয়ে বেশি সময় তিনি কারাগারে ছিলেন।
তাদের ওই যুক্তির পর ৩১ অগাস্ট আদালত নতুন প্রতিবেদন চায়। নিজাম হাজারী কারাবাসকালে কত ব্যাগ রক্ত দিয়েছেন, এর ফলে কতদিন কারাবাস রেয়াত পাওয়ার অধিকারী হয়েছেন, ৩০ দিনের মধ্যে তা প্রতিবেদন আকারে দিতে বলা হয় কারা কর্তৃপক্ষকে।
৩ নভেম্বর আবার এ বিষয়ে শুনানি শুরু হলে চট্টগ্রাম কারা কর্তৃপক্ষ আদালতকে জানায়, নিজাম হাজারীর রক্তদানের বিষয়ে কোনো নথি তাদের কাছে নেই।
এরপর দুই পক্ষের শুনানি করে হাই কোর্ট সোমবার রায়ের নতুন তারিখ ঠিক করে দেয়।
