
মো. খোশনূর আলম,১৮ জুন ১৭।। ০৮:৫৭:২৩ অপরাহ্ন
বৈশ্বিক উষ্ণতার সাথে বেড়ে চলেছে আমাদের দেশের তাপমাত্রা। বাংলাদেশের মত নাতিশীতোষ্ণ অঞ্চলেও আজ প্রাচ্যের তাপমাত্রা পরিলক্ষিত হচ্ছে। কিন্তু কেন? দিন দিন বনাঞ্চল ধ্বংস এবং ভুল বনায়নের ফলে গ্রীন হাউজ প্রতিক্রিয়া তীব্র থেকে তীব্রতর হচ্ছে।
গত ৩ জুন ‘ফলদ বাংলাদেশ’ প্রতি বছরের মত এবারো তাদের কার্যক্রম পরিচালনার জন্য বেরিয়ে পড়ে। এবার তাদের গন্তব্যস্থল ছিলো উত্তরবঙ্গের কিছু জেলা। বাস যতক্ষণ বগুড়া থেকে তেতুলিয়া পর্যন্ত ছুটে গেছে রাস্তার উভয় পাশে এবং অনতিদূরে চোখে পড়েছে এক রকমের সাদা লম্বা গাছ। হ্যাঁ, এগুলো ইউক্যালিপটাস।
আবাদী জমি, পুকুরের চারপাশে ব্যপক হারে চলছে ইউক্যালিপটাস এর চাষ। ফলদ বাংলাদেশ বাংলাবান্ধা জিরো পয়েন্ট থেকে শুরু করে একে একে তেতুলিয়া, ঠাকুরগাঁও, পীরগঞ্জ, রংপুর, কুড়িগ্রাম, জয়পুরহাট, নওগাঁ, বগুড়াতে তাদের কার্যক্রম পরিচালনা করে। এবং আশ্চর্যজনকভাবে একটি গাছের প্রাধান্য এই সব কটি জেলায় বিশেষভাবে পরিলক্ষিত হয়ে থাকে, সেটি ইউক্যালিপটাস।
আশ্চর্যের ব্যাপার হলো বেশির ভাগ মানুষ ই এই ইউক্যালিপটাস এর ক্ষতিকর দিক সম্পর্কে অবহিত নয় কিংবা তারা এ বিষয়ে উদাসীনতার পরিচয় দিয়ে যাচ্ছেন। অনেকে আবার হচ্ছেন পরিস্থিতির শিকার। ফলদ বাংলাদেশ ফলের গাছের চারা সংগ্রহ করতে উলিপুরের বন বিভাগের নার্সারীতে গেলে সেখানে এক কৃষকের সাথে কথা বলে জানতে পারে কেনো তিনি ইউক্যালিপটাস এর চারা লাগাচ্ছেন। তিনি বলেন, তার প্রতিবেশী জমির আইলে ইউক্যালিপটাস লাগিয়েছেন, ফলে তার কোনো শস্য হচ্ছে না, তিনিও বাধ্য হয়ে ইউক্যালিপটাস লাগাচ্ছেন। মানুষ সাময়িক লাভের আশায় ইউক্যালিপটাস লাগাতে উৎসাহী।
বাংলাদেশ সরকার ২০০৮ সালে ক্ষতিকর গাছ হিসেবে ইউক্যালিপটাসের চারা রোপণ ও বিপণন বন্ধ করতে বললেও স্বল্প সময়ে কাঠ বিক্রি করে লাভের আশায় উত্তরবঙ্গ হয়ে পড়ছে আরো শুষ্কতম।
গ্রামবাসীরা ‘ফলদ বাংলাদেশ’ কে ইউক্যালিপটাস সম্পর্কে যে তথ্যগুলো দিয়েছেন তা নিম্নরূপ :
১. আমরা এর ক্ষতিকর দিকসমূহ জানি না।
২. সরকার কেনো আইন করে সব ক্ষতিকর গাছ কেটে ফেলছে না।
৩. ইউক্যালিপটাস গাছ পরিবেশের ক্ষতি করে কিন্তু কয়েক বছরে অনেক টাকা পাওয়া যায়।
৪. সবাই ইউক্যালিপটাস লাগাচ্ছে তাই আমিও লাগাই কারণ আমার জমিতে ফসল হচ্ছে না।
৫. ইউক্যালিপটাস এর কাঠ বিক্রি করা তুলনামূলকভাবে সহজ।
এসবের প্রেক্ষিতে ফলদ বাংলাদেশ জনসচেতনতা বৃদ্ধির লক্ষে প্রতিটি এলাকায় স্থানীয়দের অনুমতিক্রমে গানের আসর বসিয়ে বাজারে লোকজনকে অবহিত করেছে। এছাড়াও প্রতিটি বাড়িতে একটি করে ফলের গাছ লাগানোর পাশাপাশি ইউক্যালিপটাসসহ ক্ষতিকর গাছগুলো রোপণ না করার বিষয়ে সবাইকে সচেতন করেছে। ক্ষতিকর কাঠের গাছের বিপরীতে ফলের গাছের আর্থিক ও আত্মিক লাভ তাদের সামনে আলোচনা করা হয়েছে।
ইউক্যালিপটাস এর কিছু ভালো এবং ক্ষতিকর দিক
ভালো দিক:
১. এ গাছের তেল দিয়ে এন্টিসেপ্টিক ও পরিষ্কারক উৎপন্ন হয়।
২. মশা তাড়ানোর কাজে ব্যবহৃত হয়।
৩. এর পাতায় ফরমালিটেড ফ্লোরোগ্লুসিনল আছে যার প্রচুর ওষধি গুণাগুণ রয়েছে।
৪. ঔষধ শিল্প ও কাগজ শিল্পে প্রয়োজনীয়।
৫. খুব দ্রুত বাড়ে (৫ বছরে ৯২ মিটার হতে পারে)।
এবারে আসুন এর ক্ষতিকর দিকসমূহ দেখা যাক:
১. ইউক্যালিপটাস এর ফলে ভূগর্ভস্থ পানির স্তর নেমে যায়।
২. সেচ সমস্যার সৃষ্টি করে।
৩. ১০-১২ ফুট সীমানার পানি শোষণ করে।
৪. এর আশে পাশে অন্য গাছ বা ফসল জন্মাতে পারে না।
৫. পাতা ও রেণু মানবদেহের জন্য ক্ষতিকর।
৬. পাখি বাসা বাধতে পারে না।
৭. বেশি পানি শোষণের ফলে উত্তরবঙ্গ মরুভূমির আকার ধারণ করছে।
৮. পূর্ণবয়স্ক ইউক্যালিপটাস গাছ ২৪ ঘন্টায় ৯০ লিটার পানি শোষণ করে মাটিকে শুষ্ক করে তোলে।
৯. এ গাছ লাগানোর ২০-৩০ বছর পর, পাশাপাশি অন্য গাছ জন্মাতে পারে না।
১০. অতিরিক্ত কার্বন-ডাই অক্সাইড নিঃসরণ করে যার ফলে তাপমাত্রা বৃদ্ধি পায়।
১১. পাতা সহজে পচে মাটিতে মিশে না।
১২. পুকুরের পানি দূষণ করে।
১৩. ইউক্যালিপটাস এর মাধ্যমে দাবানল সৃষ্টির আশঙ্কা প্রকট।
১৪. মাটির গভীরে সর্বোচ্চ ৩০-৩৬ ফুট পর্যন্ত যায়, ইত্যাদি।
যেসব উপকারিতা এ গাছের রয়েছে তার চেয়ে এর ক্ষতিকারক দিক অনেক বেশি। আমাদের দেশে বিশেষ করে উত্তবঙ্গের এই জেলাগুলোতে এর রোপণ অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ এবং ক্ষতিকর। জনমনে এ গাছ রাক্ষুসে গাছ হিসেবেও পরিচিত। আসুন আমরা সকলে এই রাক্ষুসীর হাত থেকে আমাদের মাতৃভূমিকে রক্ষা করি এবং বিপরীতে একটি করে ফলের গাছের চারা রোপণ করি।
: লেখক শিক্ষার্থী, জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়
এবং সমাজকর্মী, ফলদ বাংলাদেশ
