
বিভুরঞ্জন সরকার>> ০৫ নভেম্বর ১৭।। ১২:১০:৪৫ পিএম
বিএনপি চেয়ারপার্সন খালেদা জিয়ার লন্ডন সফর নিয়ে আওয়ামী লীগ নেতারা নানা ধরনের বাঁকা মন্তব্য করেছিলেন। বলা হয়েছিল, তিনি আর ফিরে আসবেন না। বিএনপির আন্দোলন টেমস নদীতে নিক্ষিপ্ত হয়েছে বলেও তাচ্ছিল্যসূচক মন্তব্য করা হয়েছিল। তিন মাস লন্ডনে থেকে চোখ এবং পায়ের চিকিৎসা নিয়ে এবং বিএনপির জন্য চাঙ্গা হওয়ার রসদ নিয়ে দেশে ফিরে খালেদা জিয়া রাজনীতিতে পর পর দুটি ছক্কা হাঁকিয়েছেন। একটি দুর্নীতি মামলায় হাজির হয়ে, আরেকটি রোহিঙ্গা শরণার্থী শিবির দেখতে গিয়ে। সরকার পক্ষ হয়তো বুঝতেই পারেনি যে খালেদা জিয়া কি করতে যাচ্ছেন। তিনি রোহিঙ্গাদের মধ্যে ত্রাণ বিতরণের নামে কার্যত রাজনৈতিক শোডাউন করেছেন এবং কৌশলের খেলায় এ যাত্রায় তিনি সরকারি দলকে কিছুটা পেছনে ফেলেছেন। আবার দুর্নীতি মামলায় হাজিরা দিতে গিয়ে তিনি আদালতে তিনদিন যে রাজনৈতিক বক্তব্য দিয়েছেন এবং গণমাধ্যমে এটা যেভাবে প্রচার পেয়েছে তাতে ব্যক্তিগতভাবে তিনি এবং তার দল বিএনপি লাভবান হয়েছে। এই প্রথম সরকারি দলকে একটু বোকা বানাতে পেরেছেন তিনি।
বেগম জিয়ার কক্সবাজার সফরে যে ত্রাণ বিতরণ মুখ্য উদ্দেশ্য ছিল না, এটা যে দল গোছানোর একটি কর্মসূচি ছিল-এটা এখন আর কাউকে ব্যাখ্যা করে বুঝিয়ে বলার দরকার নেই। ত্রাণ বিতরণ যদি উদ্দেশ্য হতো তাহলে বেগম জিয়া অসুস্থ শরীরে সড়কপথে ভ্রমণের ঝুঁকি নিতেন না। বিমানে কক্সবাজার গিয়ে তিনি সহজেই ত্রাণ বিতরণের কাজটি সারতে পারতেন। কিন্তু তিনি কক্সবাজার যাওয়া-আসা করলেন বিরাট গাড়িবহর নিয়ে। এটা ঝুঁকিপূর্ণ হলেও বিএনপির অস্তিত্ব জানান দেয়ার জন্য প্রয়োজন ছিল। লক্ষ্য অর্জনে বিএনপি সফল হয়েছে। সরকার এবং সরকারি দল মনে করছে, দল হিসেবে বিএনপি এখন দুর্বল এবং নেত্রী হিসেবে খালেদা জিয়াও বাতিলের খাতায়। সরকার সমর্থক কেউ কেউ এ ধরনের মত পোষণ করেন এবং গণমাধ্যমে তা লিখে বা বলে প্রচারও করেন। সরকারি মহলে যে আত্মতৃপ্তির ভাব বিরাজ করছে তাতে একটি মৃদু ধাক্কা হলেও দিতে পেরেছেন খালেদা জিয়া।
খালেদা জিয়ার কক্সবাজার সফর শেষ পর্যন্ত নিরাপদ হলেও নির্বিঘ্ন হয়নি। যাওয়া ও আসার পথে দু’বারই ফেনীতে খালেদা জিয়ার গাড়িবহরে হামলার ঘটনা ঘটেছে। যদিও এই হামলায় বেগম জিয়া এবং তার সফরসঙ্গীদের কারো কোনো ক্ষতি হয়নি। যাওয়ার পথে সাংবাদিকদের গাড়িতে হামলা হয়েছে। কয়েকটি গাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ফেরার পথে দুটি বাস পুড়িয়ে দেয়া হয়েছে, বাস দুটি খালেদা জিয়ার বহরে ছিল না। এই হামলার ঘটনায় আওয়ামী লীগ দুষছে বিএনপিকে আর বিএনপি দুষছে সরকার ও আওয়ামী লীগকে। এটাই স্বাভাবিক। আমাদের দেশে যে দোষারোপের রাজনীতির ধারা শুরু হয়েছে তা থেকে বেরিয়ে আসার চেষ্টা কারো নেই। বিএনপির অন্তর্বিরোধের জেরে যেমন ফেনীর দুর্বৃত্তি ঘটে থাকতে পারে, তেমনি নিজের নাক কেটে পরের যাত্রাভঙ্গের মতো আওয়ামী ক্যাডার বাহিনীও কাজটি করতে পারে। দ্বিতীয়টির সম্ভাবনা বেশি বলেই মনে হয়। বিএনপির যা অবস্থা তাতে দলনেত্রীর গাড়িবহরে হামলা চালিয়ে ‘খবর’ তৈরির দুর্বুদ্ধি কারো না দেখানোরই কথা। তবে আমাদের দেশের রাজনীতিতে এখন কাঁচা বুদ্ধির লোকজনেরই প্রাধান্য। কাজেই ফেনীর কাঁচা কাজ দুই দলের দিক থেকেই হওয়ার বিষয়টি উড়িয়ে দেয়া যায় না। তবে যে বা যারাই ঘটনাটা ঘটিয়ে থাকুক না কেন, তাতে লাভ হয়েছে বিএনপির। অনেক আওয়ামী লীগ সমর্থকও বিষয়টি পছন্দ করেননি। বেগম জিয়া একজন সাবেক প্রধানমন্ত্রী এবং দেশের একটি বড় দলের প্রধান নেত্রী। তার নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দায়িত্ব সরকারের। বিএনপির কেউ যদি বেগম জিয়ার গাড়িবহরে হামলা করে থাকে তার দায়ও সরকারকেই নিতে হবে।
সরকার চায়নি বেগম জিয়ার যাত্রাপথে ব্যাপক জনসমাগম হোক। কিছু কিছু ক্ষেত্রে প্রতিবন্ধকতা বা অন্তরায় সৃষ্টির চেষ্টার খবরও পাওয়া গেছে। এসব করে লাভ হয়নি। পথে পথে মানুষ ভয়ভীতি উপেক্ষা করে বেগম জিয়াকে স্বাগত জানাতে সমবেত হয়েছেন। তাদের সংখ্যা একেবারে কম নয়। সমবেত সব মানুষ যদি বিএনপির কর্মী-সমর্থকও হয়ে থাকে, তাহলেও এটা বলতে হবে যে, এত কিছুর পরও বিএনপির গোড়া একেবারে আগলা হয়নি। আর সাধারণ মানুষকে কাছে টানার ক্ষমতাও বেগম জিয়ার নিঃশেষ হয়ে যায়নি। মানুষ টানার এই সক্ষমতা যতদিন থাকবে ততদিন বিএনপির শক্তিকে উপেক্ষা করা বুদ্ধিমানের কাজ হবে না।
রোহিঙ্গা ইস্যু নিয়ে সরকারকে বেকায়দায় বা চাপে ফেলার আশা ছিল বিএনপির। কিন্তু সেটা সম্ভব হয়নি। মিয়ানমার থেকে পালিয়ে আসা লাখ লাখ রোহিঙ্গাকে নিরাপদ আশ্রয় দিয়ে শেখ হাসিনা এবং তার সরকার এর মধ্যেই বিশ্ব সম্প্রদায়ের মনোযোগ ও সমর্থন লাভ করেছেন। মিয়ানমার সরকারের ওপর চাপ সৃষ্টিতে কিংবা চীন, রাশিয়া এবং ভারতের সমর্থন লাভে সরকারের কূটনৈতিক ব্যর্থতার সমালোচনা করেও বিএনপি খুব সুবিধা করতে পারবে বলে মনে হয় না। কোনো দেশই তার নিজের স্বার্থের বাইরে গিয়ে কিছু করে না। ভূ-রাজনৈতিক স্বার্থের জটিল সমীকরণ রোহিঙ্গা সমস্যাকে তীব্র করে তুলেছে। তারপরও শেখ হাসিনার সরকার রোহিঙ্গা-রাজনীতিতে একেবারে অসহায় অবস্থায় নেই।
শরণার্থীদের মধ্যে ত্রাণ বিতরণের পর এক রোহিঙ্গা শিশুকে কোলে তুলে নিয়েছিলেন খালেদা জিয়া। এই ছবিটি বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রচার হয়েছে। রোহিঙ্গা শিশু কোলে নিয়ে বেগম জিয়া সম্ভবত শেখ হাসিনাকে টেক্কা দিতে চেয়েছেন। কিন্তু শেখ হাসিনার মানবিক গুণ স্বতঃস্ফূর্ত। তিনি কাউকে বুকে টানলে তার মধ্যে কোনো কৃত্রিমতা থাকে না। আর খালেদা জিয়া যেভাবে শিশুটিকে কোলে নিয়েছেন তাতে তার আড়ষ্টতা আড়াল করা যায়নি। কারণ এতে তিনি অভ্যস্ত নন। তারপরও বেগম জিয়ার এই চর্চার প্রশংসা করতে হয়। খারাপের প্রতিযোগিতা না করে ভালোর প্রতিযোগিতা সব সময়ই সমর্থনযোগ্য।
জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট দুর্নীতি মামলায় আদালতে আত্মপক্ষ সমর্থন করে লম্বা বক্তৃতা করছেন খালেদা জিয়া। তার বক্তৃতা পুরোপুরি রাজনৈতিক। আইনি বিষয়ে না গিয়ে তিনি আদালতকে সরকারবিরোধী প্রচার কাজে ব্যবহার করছেন। সরকারের বিরুদ্ধে তার যা যা বলার আছে তার সবই তিনি বলছেন। গণমাধ্যমে তার বক্তৃতা প্রচার হচ্ছে। মামলার ফলাফল সম্পর্কেও তিনি আগাম আশঙ্কা ব্যক্ত করে রাখছেন। তিনি বলেছেন, তাকে রাজনীতি থেকে সরাতে ও নির্বাচনে অযোগ্য ঘোষণা করতে ক্ষমতাসীনরা একটি নীলনকশা করেছে। তিনি বলেছেন, মামলার রায়ে আমার সাজা হবে এবং আমাকে কাশিমপুর কারাগারে রাখা হবে বলে ইতিমধ্যে কোনো মন্ত্রী প্রকাশ্যে ঘোষণা করেছেন।
খালেদা জিয়া আদালতে বলেছেন, দেশের অনেক গুরুত্বপূর্ণ মামলা বছরের পর বছর ধরে চলছে বা ঝুলে আছে। কিন্তু তার বিরুদ্ধে মামলাগুলো রকেটের গতি পেয়েছে। যেন কেউ পেছন থেকে তাড়া করছে, শিগগির শেষ করো। তিনি প্রশ্ন রাখেন, কেন, কোন উদ্দেশ্যে এবং কিসের জন্য এত তাড়াহুড়া? এই তাড়াহুড়ায় কি ন্যায়বিচার নিশ্চিত হবে? নাকি ন্যায়বিচারের কবর রচিত হবে?
আত্মপক্ষ সমর্থন করে খালেদা জিয়া আদালতে বক্তব্য দেয়া শুরু করেছেন ১৯ অক্টোবর। এক ঘণ্টার বেশি বলেও বক্তব্য শেষ করেননি। এরপর ২৬ অক্টোবর এবং ২ নভেম্বর তিনি আবার বক্তব্য দেন এবং যথারীতি তা অসমাপ্ত থাকে। বাকি বক্তব্য দেয়ার জন্য আদালত ৯ নভেম্বর পরবর্তী দিন ধার্য করেছেন। সেদিনও তার বক্তব্য শেষ হবে কিনা কে জানে! বিএনপি নেত্রী অভিযোগ করেছেন, তার মামলা নিয়ে তাড়াহুড়া করা হচ্ছে। কিন্তু বাস্তব ঘটনা তা বলে না। ফখরুদ্দিন-মইনুদ্দিনের তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে এই মামলাটি দায়ের করা হয়। বিচারিক কার্যক্রম শুরু হয়েছে এই সরকারের আমলে। তার মামলাটিও বছরের পর বছর ধরেই চলছে। তিনি নিজেও নানা উপায়ে চেষ্টা করছেন মামলাটিকে ঝুলিয়ে রাখতে। অসংখ্যবার সময় নিয়েছেন, আদালতে অনুপস্থিত থেকেছেন। উচ্চ আদালতের দ্বারস্থ হয়েছেন। দুদকের আইনজীবী মোশাররফ হোসেনের দেয়া তথ্য মতে, খালেদা জিয়া ৩০ দফায় সময় নিয়েছেন। মোট ৮ মাস ১০ দিন মামলার কাজে বিলম্ব ঘটিয়েছেন। অর্থাৎ মামলা থেকে রেহাই পাওয়ার সব আইনি প্রক্রিয়ার সুযোগ তিনি নিয়েছেন। কোনো সাধারণ বিচারপ্রার্থীর পক্ষে কি এই সুযোগ গ্রহণ সম্ভব হতো? তারপরও যখন মামলা নিয়ে তিনি তাড়াহুড়ার অভিযোগ করেন তখন তার উদ্দেশ্যের সততা নিয়ে প্রশ্ন না তুলে পারা যায় কি?
১৯ অক্টোবর আদালতে বক্তব্য দিতে গিয়ে একপর্যায়ে খালেদা জিয়া চোখের পানি ধরে রাখতে পারেননি। তিনি কেঁদেছেন। তার এই কান্না খুব বেশি জনের মনে সহানুভূতির জš§ দিতে পেরেছে বলে মনে হয় না। এর আগে ক্যান্টনমেন্টের বাড়িহারা হয়েও তিনি কেঁদেছিলেন। মানুষ দেখছে, বেগম জিয়া কাঁদেন শুধু নিজের জন্য, নিজের স্বার্থ বিপন্ন হতে দেখলেই কেবল তার চোখের পানি বাধা মানে না। দেশের জন্য, দেশবাসীর জন্য তার কান্না নেই, বেদনাবোধ নেই। মানুষ অন্তত তেমন দৃশ্য দেখার সুযোগ পায়নি।
বেগম জিয়া এখন বিচার বিভাগের স্বাধীনতা নিয়ে কথা বলছেন। দেশে ন্যায়বিচারের উপযোগী সুষ্ঠু-স্বাভাবিক পরিবেশ ও পরিস্থিতি এখন নেই বলে অভিযোগ করছেন। বলছেন, বিচার বিভাগ স্বাধীন ও স্বাভাবিকভাবে বিচার কাজ পরিচালনা করতে পারছেন না। এ সব কথা বলার আগে তিনি কি তার শাসনামলের দিকে একবারও ফিরে তাকান? তখন আদালত স্বাধীন ছিল? বঙ্গবন্ধু হত্যা মামলা নিয়ে টালবাহানা করা হয়েছিল কি ন্যায়বিচারের পথ উন্মুক্ত করার জন্য?
খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে দায়ের করা দুর্নীতির মামলাগুলো যদি মিথ্যা ও উদ্দেশ্যমূলক হয়ে থাকে তাহলে আদালতেই তাকে সেটা প্রমাণ করতে হবে। তার দলে সব বাঘা আইনজীবী রয়েছেন। তাছাড়া বেগম জিয়ার তো আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হওয়ার কথা। কারণ তিনি দেশের সাবেক প্রধানমন্ত্রী। তিনি নিশ্চয়ই বিশ্বাস করেন আইন সবার জন্য সমান। দেশের বিচার প্রক্রিয়ার দীর্ঘসূত্রিতা নিয়ে সমালোচনা আছে। বিলম্বিত বিচার অনেক সময় ন্যায়বিচারের পথ রুদ্ধ করে। তাই বিচারপ্রার্থীরা সবাই বিচার কাজ দ্রুত নিষ্পত্তি কামনা করেন। অথচ খালেদা জিয়ার পছন্দ বিলম্বিত বিচার। কেন?
ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী সুষমা স্বরাজের সঙ্গে দেখা করার জন্য খালেদা জিয়া তড়িঘড়ি দেশে ফিরেছেন বলে অনেকেই বলছেন। সুষমার দেখা তিনি পেয়েছেন। তবে তার কাছ থেকে আশা কতটুকু পেয়েছেন তা নিয়ে রাজনৈতিক মহলে সংশয় আছে। দেশে ফিরে কক্সবাজার গিয়ে তিনি যেমন বিএনপিকে একটু চাঙ্গা করতে পেরেছেন, তেমনি সরকারকেও একটু ঝাঁকুনি দিতে পেরেছেন। আদালতের দীর্ঘ বক্তৃতাও তাকে কিছু বোনাস পয়েন্ট দেবে। এখন দেখার বিষয় তিনি পরের ধাপে কী করেন।
লেখক : সাংবাদিক, কলাম লেখক
